বাংলাদেশে সম্প্রতি একের পর এক শিশু নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর আমরা ক্ষুব্ধ হয়েছি, অপরাধীর শাস্তি দাবি করেছি, ভিডিও শেয়ার করেছি, মন্তব্য করেছি। কিন্তু খুব কমই ভেবেছি- যে শিশুকে আমরা রক্ষা করতে চাই, সেই শিশুর সবচেয়ে অসহায় মুহূর্তকেই কি আমরা লক্ষ মানুষের সামনে স্থায়ীভাবে তুলে দিচ্ছি না? নির্যাতনের বিচার অবশ্যই জরুরি। কিন্তু বিচার চাইতে গিয়ে যদি একজন শিশুর মর্যাদা, গোপনীয়তা ও ভবিষ্যৎকেও বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে সেই ন্যায়বিচার কতটা শিশুকেন্দ্রিক?
এই প্রশ্নটি আজ শুধু বাংলাদেশের নয়; এটা বিশ্বব্যাপী শিশু অধিকার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গত কয়েক বছরে শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, আইনবিদ ও ডিজিটাল নীতিনির্ধারকেরা দুটি শব্দকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করছেন- Sharenting এবং Kidfluencing। প্রথমটি বোঝায় সন্তানকে নিয়ে অতিরিক্ত ছবি, ভিডিও ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করার প্রবণতা। দ্বিতীয়টি বোঝায় শিশুকে কেন্দ্র করে অনুসারী, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরি করা। অনেক গবেষক মনে করেন, এই দুটি প্রবণতা মিলেই ডিজিটাল যুগে শিশু অধিকারের এক নতুন সংকট তৈরি করেছে।
একসময় পারিবারিক অ্যালবাম ছিল স্মৃতির ভাণ্ডার। সেখানে একজন শিশুর প্রথম হাঁটা, প্রথম স্কুলে যাওয়া বা জন্মদিনের ছবি সংরক্ষিত থাকত পরিবারের জন্য। এখন সেই সীমা ভেঙে গেছে। শিশুর কান্না, অসুস্থতা, শাস্তি, ক্ষুধা, ভয়, পরীক্ষার ফল, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা, এমনকি ব্যক্তিগত দুর্বলতার মুহূর্তও কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লাখো মানুষের সামনে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ভিডিও থেকে বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, লাইভ উপহার কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল আয়ও হচ্ছে। অর্থাৎ, একজন শিশুর জীবন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ নিচ্ছে।
এ কারণেই সাম্প্রতিক একাডেমিক গবেষণায় একটি নতুন শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে- ডিজিটাল কমোডিফিকেশন অব চাইল্ডহুড। অর্থাৎ, শিশুর শৈশবকে এমন এক পণ্যে পরিণত করা, যার মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে ভিউ, লাইক, শেয়ার এবং বিজ্ঞাপনী আয়ের মাধ্যমে। শিশু তখন আর কেবল পরিবারের সদস্য থাকে না; সে হয়ে ওঠে একটি ব্র্যান্ড, একটি অ্যালগরিদমের উপাদান, একটি বাজারজাতযোগ্য পরিচয়।
এটা নিছক নৈতিক বিতর্ক নয়; এটা আইনি প্রশ্নও। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ (UN Convention on the Rights of the Child) বলছে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে একজন শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ (Best Interests of the Child)-কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। একই সনদে শিশুর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা এবং অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষার অধিকারও স্বীকৃত। অর্থাৎ, কোনো কাজ আইনগতভাবে বৈধ হলেই সেটা শিশুর অধিকারসম্মত হয়ে যায় না। প্রশ্ন হলো- কাজটি শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করছে কিনা।
UNICEF-ও অভিভাবকদের সতর্ক করে বলেছে, অনলাইনে সন্তানের ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে হবে। কারণ একজন শিশু বড় হয়ে নিজের শৈশব সম্পর্কে নিজেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে। অথচ আজ তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অন্যরা। যে ভিডিওটি আজ মজার মনে হচ্ছে, সেটাই হয়তো দশ বছর পরে তার জন্য অপমান, বিব্রতবোধ কিংবা মানসিক চাপের কারণ হবে।
এখানেই আসে Informed Consent বা অর্থপূর্ণ সম্মতির প্রশ্ন। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের ছবি, তথ্য বা অভিজ্ঞতা প্রকাশের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। কিন্তু একজন পাঁচ বছরের, সাত বছরের বা দশ বছরের শিশু কি বুঝতে পারে যে তার একটি ভিডিও কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে, সেটা সংরক্ষিত থাকবে, কপি হবে, অন্য প্ল্যাটফর্মে ছড়াবে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পরিবর্তিতও হতে পারে? উত্তরটি স্পষ্ট- না। সে কারণেই শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিভাবকের আইনি অভিভাবকত্ব এবং শিশুর ব্যক্তিগত অধিকার এক জিনিস নয়। একজন অভিভাবকের সিদ্ধান্তও তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তা সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট। আজকের একটি পোস্ট আগামী বিশ বছর পরও ইন্টারনেটের কোথাও থেকে যেতে পারে। একজন শিশুর জন্মের পর থেকেই যদি তার প্রতিটি মুহূর্ত অনলাইনে নথিভুক্ত হয়, তাহলে সে নিজের অজান্তেই একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় নিয়ে বড় হয়। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরি, সামাজিক সম্পর্ক কিংবা ব্যক্তিগত মর্যাদার ক্ষেত্রেও এই পরিচয়ের প্রভাব পড়তে পারে। একজন মানুষের নিজের অতীত নিয়ন্ত্রণ করার অধিকারও এক ধরনের মানবাধিকার। ডিজিটাল যুগে সেই অধিকার শিশুদের কাছ থেকে খুব অল্প বয়সেই কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রেই আছে অর্থনীতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম আবেগকে পুরস্কৃত করে। কান্না, বিস্ময়, ভয়, অসুস্থতা, নাটকীয়তা- এসবই বেশি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ফলে একজন শিশুর ব্যক্তিগত বেদনা কখন যে অ্যালগরিদমের খাদ্যে পরিণত হয়, তা অনেকেই বুঝতেও পারেন না। আর যখন সেই দৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয় বিজ্ঞাপন ও আয়, তখন নৈতিক সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নতুন বাস্তবতাকে ঘিরে আইনও দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। কারণ রাষ্ট্রগুলো বুঝতে পারছে, বিষয়টি আর শুধু পারিবারিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি শিশু অধিকার, শ্রম, গোপনীয়তা এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি জটিল প্রশ্ন।
২০২০ সালে ফ্রান্স বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে শিশু ইনফ্লুয়েন্সারদের সুরক্ষায় বিশেষ আইন প্রণয়ন করে। আইনের মূল দর্শন ছিল স্পষ্ট- যদি কোনো শিশু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে আয় করে, তাহলে সেই আয়ের মালিক কেবল মা-বাবা নন; শিশুরও অধিকার আছে। কাজের সময়, আয়ের হিসাব এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আইনের আওতায় আনা হয়। পরবর্তী সময়ে ফ্রান্স শিশুদের অনলাইন ছবি ও ভিডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আরও কঠোর অবস্থান নেয়। আদালত প্রয়োজনে এমন অভিভাবকের বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করতে পারে, যিনি সন্তানের গোপনীয়তা ও মর্যাদা ধারাবাহিকভাবে ক্ষুণ্ন করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রেও একই আলোচনা শুরু হয়েছে। ইলিনয়, মিনেসোটা এবং ক্যালিফোর্নিয়াসহ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য শিশু ইনফ্লুয়েন্সারদের আয়ের অংশ সংরক্ষণ এবং তাদের শ্রমের স্বীকৃতি নিয়ে আইন করেছে বা আইন সংস্কারের পথে এগিয়েছে। এর পেছনে যুক্তি একটাই- যে শিশু পরিবারের ডিজিটাল আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে, তার শ্রম ও ভবিষ্যৎ আর্থিক অধিকারকে উপেক্ষা করা যায় না।
এটা আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তোলে- একজন শিশুকে যদি প্রতিদিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হয়, একই দৃশ্য বারবার ধারণ করতে হয়, নির্দিষ্ট সময়ে ভিডিও বানাতে হয়, স্পনসরের চাহিদা অনুযায়ী উপস্থিত হতে হয় কিংবা নিজের স্বাভাবিক শৈশবের বদলে অ্যালগরিদমের চাহিদা পূরণ করতে হয়, তাহলে সেটিকে আমরা কী বলব? পারিবারিক বিনোদন, নাকি ডিজিটাল শিশুশ্রম?
অনেক আইনবিদ বলছেন, ডিজিটাল যুগে শিশুশ্রমের সংজ্ঞা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ শ্রম মানেই শুধু কারখানা, ইটভাটা বা কৃষিক্ষেত্র নয়; একজন শিশুর সময়, ব্যক্তিগত জীবন, আবেগ এবং পরিচয় যদি অর্থনৈতিক মূল্য তৈরির উপকরণে পরিণত হয়, তবে সেটিও শ্রমের একটি নতুন রূপ। পার্থক্য শুধু এতটুকু- এখানে মজুরি আসে পর্দার আড়াল দিয়ে, আর কর্মস্থল হলো মোবাইল ফোনের ক্যামেরা।
মনোবিজ্ঞানের গবেষণাও এই উদ্বেগকে সমর্থন করছে। শিশুদের আত্মপরিচয় গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। এই সময়ে যদি তারা অনুভব করে যে তাদের মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে কত মানুষ তাদের ভিডিও দেখছে, কত লাইক পড়ছে বা কত মন্তব্য আসছে, তাহলে আত্মপরিচয়ের ভিত্তিই বদলে যেতে পারে। আত্মসম্মানবোধের জায়গায় জন্ম নিতে পারে বাহ্যিক স্বীকৃতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। একজন শিশু তখন নিজের জন্য নয়, দর্শকের জন্য বাঁচতে শেখে।
আরও গভীর একটি সমস্যা আছে। ক্যামেরা সব সময় সত্য ধারণ করে না; অনেক সময় ক্যামেরা সত্য তৈরি করে। যখন একজন শিশুর কান্না বেশি ভিউ আনে, তখন অজান্তেই সেই কান্নাকে ধারণ করার প্রবণতা বাড়ে। যখন একজন অসুস্থ শিশুর ভিডিওতে সহানুভূতি বেশি আসে, তখন সেই মুহূর্তও কনটেন্টে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অধিকাংশ অভিভাবক সচেতনভাবে এমনটি করেন না; কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম মানুষকে ধীরে ধীরে সেই দিকেই ঠেলে দেয়। প্রযুক্তি তখন শুধু একটি মাধ্যম থাকে না; মানুষের আচরণও প্রভাবিত করতে শুরু করে।
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নতুন ঝুঁকি যুক্ত হয়েছে। আজ একজন শিশুর ছবি বা ভিডিও শুধু দেখা হয় না; তা ডাউনলোড করা যায়, পরিবর্তন করা যায়, অন্য প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা যায়, এমনকি ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরির উপাদান হিসেবেও কাজে লাগানো যায়। আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করছে, অনলাইনে প্রকাশিত প্রত্যেক শিশুর ছবিই সম্ভাব্যভাবে স্থায়ী ডিজিটাল সম্পদ, যার ওপর শিশুর নিজের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত।
বাংলাদেশে এই আলোচনা এখনো প্রায় অনুপস্থিত। আমরা এখনো বিষয়টিকে মূলত নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে দেখি- পোস্ট করা উচিত কি উচিত নয়'। কিন্তু বিশ্ব এখন এই বিতর্ককে শিশু অধিকার, তথ্যের অধিকার, গোপনীয়তা, শ্রম, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্মিলিত প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। অর্থাৎ, এটা আর কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সংস্কৃতি নয়; এটা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্ন।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- শিশুর সুরক্ষার ধারণাকে ডিজিটাল বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। আমাদের আইন শিশুনির্যাতন, পর্নোগ্রাফি, সাইবার অপরাধ বা শিশুর পরিচয় প্রকাশের মতো বিষয় নিয়ে কিছু সুরক্ষা দিলেও, sharenting, kidfluencing কিংবা শিশুর ডিজিটাল গোপনীয়তা নিয়ে এখনো সুস্পষ্ট নীতিমালা নেই। একজন শিশুর ছবি বা ভিডিও থেকে যদি নিয়মিত আয় হয়, সেই আয়ের মালিকানা কার হবে, শিশুর ভবিষ্যতের জন্য কত অংশ সংরক্ষিত থাকবে, কিংবা কোনো অভিভাবক সন্তানের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে ধারাবাহিকভাবে কনটেন্ট প্রকাশ করলে রাষ্ট্র কোথায় হস্তক্ষেপ করবে- এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের আইনে স্পষ্ট নয়।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। শিশু-সম্পর্কিত ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত অপসারণ, নির্যাতনের শিকার শিশুদের ভিডিওর পুনঃপ্রচার সীমিত করা, শিশুর ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত রাখা এবং অ্যালগরিদম যেন শিশুদের কষ্টকে ভাইরাল হওয়ার উপাদানে পরিণত না করে- এসব ক্ষেত্রেও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে এই দায়বদ্ধতা বাড়ানোর পথে হাঁটছে; বাংলাদেশকেও সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পরিবারের। সন্তান কোনো সম্পত্তি নয়, যার প্রতিটি মুহূর্ত প্রকাশ করার অধিকার অভিভাবকের সীমাহীন। সন্তান একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, যার নিজের মর্যাদা, গোপনীয়তা এবং ভবিষ্যৎ আছে। একজন দায়িত্বশীল অভিভাবকের প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত- আমি কি এই ছবি বা ভিডিওটি আমার সন্তানের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে প্রকাশ করছি, নাকি মুহূর্তের আবেগ, সামাজিক স্বীকৃতি বা আর্থিক লাভের জন্য?
একই প্রশ্ন শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সাংবাদিক এবং সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদেরও করা দরকার। কোনো নির্যাতনের ভিডিও শেয়ার করার আগে আমাদের ভাবা উচিত, সেটা কি সত্যিই ন্যায়বিচারে সহায়তা করছে, নাকি একজন শিশুর কষ্টকে আরও অসংখ্যবার পুনরাবৃত্ত করছে? কোনো শিশুর কান্না, আতঙ্ক বা অপমান যদি লক্ষ মানুষের পর্দায় বারবার ফিরে আসে, তাহলে সেই স্মৃতি থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ তার কোথায়?
আমরা প্রায়ই বলি, শিশুদের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে হবে। অথচ ডিজিটাল যুগে আমরা অজান্তেই তাদের ভবিষ্যতের ওপর এমন এক স্থায়ী ছাপ রেখে দিচ্ছি, যার জন্য তারা কখনো সম্মতি দেয়নি। আজ যে শিশু নিজের কথা বলতে পারে না, আগামীকাল সেই মানুষই হয়তো প্রশ্ন করবে- আমার শৈশব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমার ছিল না কেন? আমার সবচেয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো কে সবার সামনে তুলে ধরার অধিকার পেল?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের এখনই খুঁজতে হবে।
কারণ, প্রযুক্তির অগ্রগতি তখনই সভ্যতার অগ্রগতি, যখন তা মানুষের মর্যাদাকে আরও নিরাপদ করে; তাকে বাজারের পণ্যে পরিণত করে না। একজন শিশুর শৈশব কোনো পণ্য নয়, কোনো ব্র্যান্ড নয়, কোনো অ্যালগরিদমের খাদ্য নয়। শৈশব মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়, আর সেই সময়ের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো- মনিরাপদ থাকা, সম্মান নিয়ে বড় হওয়া এবং নিজের গল্পটি একদিন নিজের ভাষায় বলার সুযোগ পাওয়া।
ডিজিটাল যুগে তাই শিশু সুরক্ষার নতুন সংজ্ঞা লিখতে হবে। সেখানে শিশুকে শুধু নির্যাতন থেকে নয়, অতিরিক্ত প্রদর্শন থেকেও রক্ষা করতে হবে; শুধু শারীরিক সহিংসতা থেকে নয়, ডিজিটাল শোষণ থেকেও রক্ষা করতে হবে; শুধু বর্তমান নয়, তার ভবিষ্যৎ পরিচয়, মর্যাদা ও স্বাধীনতাকেও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
একটি সভ্য সমাজের পরীক্ষা আজ আর শুধু এই প্রশ্নে নয় যে, সে তার শিশুদের কতটা ভালোবাসে। বরং এই প্রশ্নে- সে কি তার শিশুদের এমনকি ক্যামেরার সামনেও মানুষ হিসেবেই দেখতে পারে, নাকি কনটেন্ট হিসেবে?