আমার স্ত্রীর অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে বাগান আছে। মাঝেমধ্যে দেখি সে গাছের পাশে বসে একা একা গাছের সাথে কথা বলছে। এমনভাবে সে গাছের সাথে কথা বলে শুনলে মনে হয় গাছ যেন তার সব কথা শুনছে আর বুঝতে পারছে। গাছও যেন তার কথার উত্তর দিচ্ছে।
সে ক্যান্সার সারভাইভরস। তার ক্যান্সার হওয়ার পর ছাদের বাগানের গাছের প্রতি আরও বেশি করে ঝুঁকে পড়ে। তাকে দেখে মনে হয় গাছ তাকে মানসিক শক্তি জোগায় আর সে কথা বলে গাছকে উজ্জীবিত রাখে। গাছ বেড়ে ওঠে তরতর করে।
মানুষ যখন গাছের সঙ্গে কথা বলে, বাইরে থেকে দৃশ্যটি দেখতে খানিক অদ্ভুত মনে হতে পারে। কেউ বারান্দার টবে রাখা মানিপ্ল্যান্টকে সারাদিনের গল্প বলেন, কেউ ফুলের সঙ্গে কথা বলেন, কেউ আবার গাছের নতুন পাতা বের হওয়া দেখে তাকে অভিনন্দন জানান। আমরা জানি, গাছ উত্তর দেয় না। তবু মানুষ কথা বলে। প্রশ্ন হলো, এই কথোপকথনের উপকারটা কোথায়! গাছের, নাকি মানুষের!
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, ‘গাছের সঙ্গে কথা বললে মানসিক চাপ কমে, সাথে সাথে গাছের বৃদ্ধি ঘটে।’ কথাটির প্রথম অংশের পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি তৈরি হচ্ছে, দ্বিতীয় অংশটির ক্ষেত্রে বিজ্ঞান এখনো অনেক বেশি সতর্ক। গাছের সঙ্গে কথা বলা মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে- তবে গাছ মানুষের ভাষা বোঝে এবং প্রশংসা শুনে দ্রুত বেড়ে ওঠে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো শক্ত প্রমাণ এখনো খোঁজা হচ্ছে। গবেষণা হচ্ছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পৃথিবীজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের সংকট ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, ২০২১ সালে বিশ্বের প্রায় ১১০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধি নিয়ে বেঁচে ছিলেন- অর্থাৎ প্রায় প্রতি সাতজনে একজন। উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন প্রায় ৩৫ কোটি ৯০ লাখ মানুষ। বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের চূড়ান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের ১৮.৭ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। নারীদের ক্ষেত্রে এই হার ২১.৫ শতাংশ, পুরুষদের ১৫.৭ শতাংশ। বিষণ্নতাজনিত ব্যাধির হার ৬.৭ শতাংশ এবং উদ্বেগজনিত ব্যাধির হার ৪.৭ শতাংশ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্কদের ৯২.৩ শতাংশ চিকিৎসা বা মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পান না। শিশুদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভালো নয়। ৭-১৭ বছর বয়সীদের ১২.৬ শতাংশের মধ্যে মানসিক ব্যাধির উপস্থিতি পাওয়া গেছে এবং তাদের ৯৪.৫ শতাংশ প্রয়োজনীয় সেবা পায় না।
এই বাস্তবতায় টবের গাছের সামনে বসে কিছুক্ষণ কথা বলা নিতান্তই তুচ্ছ কোনো ব্যাপার নয়।
তবে এখানে ‘গাছের সঙ্গে কথা’ ব্যাপারটিকে আক্ষরিক অর্থে না দেখে আচরণ হিসেবে দেখা দরকার। গাছ কথা শোনে কিনা, তা এখনো প্রমাণিত নয়; কিন্তু গাছের কাছে বসে কথা বলার সময় মানুষ ধীর হয়, নিজের মনোযোগকে অন্যদিকে সরিয়ে নেয়, নিজের অনুভূতিগুলো ভাষায় প্রকাশ করে এবং কিছু সময়ের জন্য ডিজিটাল স্ক্রিন, কাজের চাপ, সামাজিক উত্তেজনা কিংবা উদ্বেগ থেকে দূরে থাকে। গাছ কোনো পাল্টা প্রশ্ন করে না, তর্ক করে না, বিচার করে না। ফলে অনেকের কাছে সেটা হয়ে উঠতে পারে এক ধরনের নীরব শ্রোতা।
এখানে একটি ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় গবেষণার কথা বলা যায়। ২০২২ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একটি গাছ দেওয়া হয় এবং তাদের ১৫ মিনিট করে গাছটির সঙ্গে নিজেদের কথা বলার জন্য বলা হয়। চার সপ্তাহ ধরে স্ব-প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য নেওয়ার পর গবেষকেরা দেখতে পান, শিক্ষার্থীদের মধ্যে চাপ ও নার্ভাসনেস কমার এবং শিথিলতা বাড়ার প্রবণতা ছিল। তবে গবেষণাটি ছিল স্ব-নির্দেশিত জরিপনির্ভর এবং ছোট পরিসরের; ফলে এটাকে খুব শক্তিশালী চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে গাছ আর মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর গবেষণার ভিত্তি অনেক শক্তিশালী। ২০২৬ সালে Nature Human Behaviour-এ প্রকাশিত এক বিশাল পর্যালোচনায় ১১৬টি systematic review এবং ৩০টি review-এর second-order meta-analysis করা হয়েছে, যেখানে মোট ৩,৮৭০টি primary study এবং আনুমানিক এক কোটির বেশি অংশগ্রহণকারীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রকৃতিনির্ভর হস্তক্ষেপ উদ্বেগ, বিষণ্নতার উপসর্গ, হৃদ্স্পন্দন ও নেতিবাচক আবেগ কমানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল; উদ্বেগের ক্ষেত্রে pooled effect size ছিল -0.83 এবং বিষণ্নতার উপসর্গের ক্ষেত্রে -0.72। একই সঙ্গে ইতিবাচক আবেগ ও relaxation-ও বেড়েছে। গবেষকেরা অবশ্য সতর্ক করেছেন- অনেক গবেষণায় passive control group ব্যবহৃত হয়েছে এবং intervention-এর সংজ্ঞায় যথেষ্ট বৈচিত্র্য আছে।
আরও সরাসরি গাছের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার গবেষণাও আছে। ২৪ জন তরুণকে নিয়ে একটি randomized crossover study-তে দেখা যায়, কম্পিউটারে কাজ করার তুলনায় indoor plant transplanting করার পর অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের বেশি comfortable, soothed এবং natural অনুভব করেছেন। তাদের sympathetic nervous system activity কমেছে এবং diastolic blood pressure-ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে এটিও ছোট একটি গবেষণা এবং অংশগ্রহণকারীদের সবাই ছিলেন তরুণ; তাই ফলাফল সবার ক্ষেত্রে একই হবে ধরে নেওয়া যায় না।
অর্থাৎ গাছের কাছে থাকার, গাছ ছোঁয়ার, মাটি নিয়ে কাজ করার, গাছের যত্ন নেওয়ার- অমানুষের ওপর ইতিবাচক প্রভাবের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। Horticultural therapy নিয়েও গবেষণা বাড়ছে। ২০২৫ সালের একটি systematic review ও meta-analysis-এ বিষণ্নতা ও উদ্বেগের ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়ে ১৭টি গবেষণা বিশ্লেষণ করে social and therapeutic horticulture-এর সঙ্গে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের উপসর্গ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিষণ্নতার pooled effect ছিল বড় মাত্রার, যদিও গবেষকেরা গবেষণাগুলোর heterogeneity ও bias-এর ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করেছেন।
এবার আসা যাক গাছের বৃদ্ধির প্রশ্নে।
উদ্ভিদ যে শব্দ বা কম্পনের প্রতি একেবারেই সংবেদনশীল নয়, তাও ঠিক নয়। উদ্ভিদ mechanical vibration বা sound-induced vibration-এর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে- এ নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। নির্দিষ্ট frequency, intensity এবং exposure duration-এর acoustic stimulation কিছু উদ্ভিদের বৃদ্ধি, বিপাক, প্রতিরোধব্যবস্থা ও secondary metabolites-এ পরিবর্তন আনতে পারে বলে গবেষণায় দেখা গেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। ‘গাছ শব্দে সাড়া দিতে পারে’ আর ‘গাছ মানুষের কথা বোঝে’- দুটো এক ব্যাপার নয়।
২০২৪ সালে New Phytologist-এ প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ review বলছে, উদ্ভিদের acoustic communication নিয়ে বর্তমান জ্ঞান এখনো চূড়ান্ত নয়। পরীক্ষাগুলোর অনেকগুলোতেই যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তা ছিল অত্যন্ত উচ্চমাত্রার; একটি আলোচিত গবেষণায় ৯১-৯৪ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছিল। মানুষের স্বাভাবিক কথাবার্তার শব্দমাত্রা এর তুলনায় অনেক কম। গবেষকেরা আরও বলেছেন, এখন পর্যন্ত গাছের কোনো নির্দিষ্ট sound receptor চিহ্নিত হয়নি এবং গাছ পরস্পরের সঙ্গে acoustic channel দিয়ে তথ্য বিনিময় করে- এমন প্রমাণও নেই।
এখানেই ‘গাছের সঙ্গে কথা বললে গাছ দ্রুত বাড়ে’ ধরনের জনপ্রিয় ধারণাটিকে একটু বিশ্লেষণ করে দেখা দরকার। ২০১৮ সালে IKEA-র বহুল আলোচিত ‘Bully a Plant’ সামাজিক পরীক্ষায় দুটো গাছের একটিকে ইতিবাচক এবং অন্যটিকে নেতিবাচক রেকর্ড করা কথা শোনানো হয়েছিল। ৩০ দিন পর দুই গাছের মধ্যে দৃশ্যমান পার্থক্য দেখা যায়। কিন্তু এটা ছিল মূলত bullying-বিরোধী সচেতনতা তৈরির একটি সামাজিক পরীক্ষা, peer-reviewed বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা নয়। তাই সেটাকে উদ্ভিদের ভাষা বোঝার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা এখুনি হয়তো ঠিক হবে না।
তাহলে কি গাছের সঙ্গে কথা বলা অর্থহীন?
মোটেও নয়। বরং এর অর্থটি অন্য জায়গায়।
কেউ যখন গাছকে বলেন, ‘আজ কেমন আছ?’- সম্ভবত গাছটি প্রশ্নটি বুঝছে না। কিন্তু মানুষটি নিজের মনকে কয়েক মুহূর্তের জন্য থামাচ্ছেন। গাছের শুকনো পাতাটি দেখতে গিয়ে হয়তো তিনি বুঝতে পারছেন, কয়েক দিন ধরে নিজের জীবনটাও তিনি ঠিকমতো দেখছেন না। পানি দিতে গিয়ে তিনি নিজের যত্নের কথাও মনে করতে পারেন। নতুন পাতা বের হলে আনন্দিত হন। গাছের বৃদ্ধি তখন হয়ে ওঠে নিজের জীবনের ছোট ছোট পরিবর্তন লক্ষ্য করার একটি উপলক্ষ।
এখানে গাছের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো তার ‘নীরবতা’।
আমাদের সময়ের মানুষ এমন এক পৃথিবীতে বাস করছে যেখানে প্রত্যেকেই কথা বলছে, কিন্তু সবাই শুনছে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিনিয়ত মতামত, প্রতিক্রিয়া, তর্ক, নোটিফিকেশন ও তুলনার ভিড়। সেখানে একটি গাছ কোনো মন্তব্য করে না। কোনো ‘seen’ দেয় না। কোনো বিচার করে না। সে শুধু থাকে। তার যত্ন নিতে গিয়ে মানুষ নিজের ভেতরেও কিছুটা জায়গা তৈরি করতে পারে।
তবে একটি সতর্কতা জরুরি। গাছের সঙ্গে কথা বলা মানসিক চাপ কমানোর স্বস্তিদায়ক দৈনন্দিন অভ্যাস হতে পারে; তবে এটা বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত ব্যাধি বা অন্য কোনো মানসিক রোগের চিকিৎসার বিকল্প নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশে যেখানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার treatment gap এত বড়, সেখানে ‘গাছের সঙ্গে কথা বলুন, সুস্থ থাকুন’ ধরনের সরলীকৃত বার্তা বিপজ্জনক হতে পারে। প্রকৃতিনির্ভর কার্যক্রম সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা অবশ্যই নিতে হবে। তবে যদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার নেওয়ার মতো কাছেপিঠে কোনো ব্যবস্থা না থাকে তাহলে গাছের সাথে কথা বলা প্রাথমিক উদ্যোগ হতে পারে।
এই ছোট অভ্যাসটিকে আমরা আরও বড় সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করতে পারি। শিশুদের ঘরে অন্তত একটি গাছের দায়িত্ব দেওয়া যায়। বিদ্যালয়ে ছোট বাগান করা যায়। হাসপাতাল, বৃদ্ধনিবাস, কারাগার কিংবা মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে therapeutic gardening-এর সুযোগ বাড়ানো যায়। নগরে বারান্দা, ছাদ, বিদ্যালয় ও কর্মস্থলে সবুজ জায়গা তৈরি করা যায়। কারণ গবেষণা শুধু গাছের টবের কথা বলছে না; WHO-ও বলছে, green space মানুষকে মানসিক বিশ্রাম, সামাজিক যোগাযোগ, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং stress alleviation-এর সুযোগ দেয়।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটি হয়তো ‘গাছ কি আমাদের কথা শোনে?’- এটা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, আমরা কি গাছের কাছে গিয়ে নিজেদের কথা একটু শুনতে পারি?
গাছ হয়তো আমাদের ভাষা বোঝে না। কিন্তু তার সামনে বসে আমরা যদি কয়েক মিনিটের জন্য নিজের ব্যস্ততা থামাতে পারি, নিজের অনুভূতিকে ভাষা দিতে পারি, মাটিতে হাত রাখতে পারি, শুকনো পাতা সরিয়ে দিতে পারি, নতুন কুঁড়ি দেখতে পারি- তাহলে সেই কথোপকথনের অর্থ আছে।
গাছের বৃদ্ধির জন্য ভালোবাসার শব্দ কতটা প্রয়োজন, বিজ্ঞান এখনো নিশ্চিত নয়। কিন্তু মানুষের ভালো থাকার জন্য একটু সবুজ, একটু নীরবতা এবং একটু যত্ন- তার প্রয়োজন যে গভীর, সে বিষয়ে প্রমাণ ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
হয়তো এ কারণেই গাছের সঙ্গে কথা বলা আদতে গাছকে কথা বলা নয়। এটি এমন এক কথোপকথন, যেখানে গাছ নীরব থাকে- আর মানুষ নিজের কথা শুনতে শুরু করে।