যে নদী একদিন জীবন ছিল, আজ সে মৃত্যুর স্রোত!

সুজন দে

মতামত

নেপালের পাহাড়ে আজ আর মেঘের ফাঁকে উঁকি দেওয়া সেই নীল আকাশ নেই, নেই পর্যটকের চোখে বিস্ময় জাগানো চিরচেনা সৌন্দর্য। আছে

2026-08-27T16:44:02+00:00
2026-08-27T16:44:02+00:00
  শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬,
১৩ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
মতামত
যে নদী একদিন জীবন ছিল, আজ সে মৃত্যুর স্রোত!
সুজন দে
বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:৪৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
নেপালের পাহাড়ে আজ আর মেঘের ফাঁকে উঁকি দেওয়া সেই নীল আকাশ নেই, নেই পর্যটকের চোখে বিস্ময় জাগানো চিরচেনা সৌন্দর্য। আছে কেবল ধ্বংসস্তূপ, কাদামাটি, ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা আর স্বজনের অপেক্ষায় উৎকণ্ঠিত অসংখ্য মানুষ। যে ভোতেকোশি নদীকে ঘিরে পাহাড়ি জনপদের জীবন ও জীবিকা, বুধবার সেই নদীই মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হয়েছে মৃত্যুর স্রোতে। ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো- মানুষের বহু বছরের শ্রমে গড়ে ওঠা জীবন যেন কয়েক মিনিটের উন্মত্ত জল, বরফ ও পাথরের স্রোতে মুছে গেছে।

২৬ আগস্টের এই আকস্মিক দুর্যোগে নেপালে এখন পর্যন্ত তিন শতাধিক মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ। নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, শুধু পর্যটক ও ভ্রমণকারীদের মধ্যেই ৫৭৯ জনের সন্ধান মিলছে না, যাঁদের মধ্যে ৪৬৬ জন বিদেশি। নিখোঁজদের তালিকায় স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি নিরাপত্তাকর্মী, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী এবং বিদেশি পর্যটকরাও রয়েছেন। উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পাথরের নিচে জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে চলেছেন। কিন্তু দুর্যোগের পরিসংখ্যানের আড়ালে যে মানবিক বিপর্যয়টি থাকে, তার কোনো সংখ্যা নেই।

নিখোঁজ প্রতিটি মানুষের পেছনে আছে একটি পরিবার। কোনো মা হয়তো সন্তানের ফোনের অপেক্ষায় আছেন। কোনো স্ত্রী জানেন না, শেষবার যে মানুষটির কণ্ঠ শুনেছিলেন, তিনি আদৌ ফিরবেন কি না। কোনো সন্তান হয়তো এখনো বিশ্বাস করছে, বাবা একদিন দরজায় এসে দাঁড়াবেন। মৃত্যুর সংবাদ একবার মানুষকে ভেঙে দেয়, কিন্তু নিখোঁজের অপেক্ষা মানুষকে ভাঙে প্রতিটি মুহূর্তে। একটি ফোনকল, একটি গাড়ির শব্দ, একটি অচেনা নম্বর- সবকিছুতেই জেগে ওঠে আশার আলো। আবার কয়েক মুহূর্ত পর সেই আশাই পরিণত হয় আরও গভীর উৎকণ্ঠায়।

এই দুর্যোগের ক্ষত শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। নেপালের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ৩৫টি মোটরচালিত সেতু, ৪৫টি ঝুলন্ত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় একটি সেতু ভেঙে পড়া বা একটি সড়ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নিছক যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষতি নয়। এর অর্থ হলো, আটকে পড়া মানুষের কাছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো আরও কঠিন হয়ে যাওয়া।

যে নেপাল দেখেছিলাম

২০২৪ সালের মে মাসের শেষদিকে নেপাল ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল আমার। চোখে দেখা সেই নেপাল ছিল যেন ছবির বই থেকে উঠে আসা কোনো দেশ। কাঠমান্ডুর ঐতিহ্য, পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে থাকা জনপদ, সবুজ উপত্যকা, দূরে তুষারে ঢাকা পাহাড়- সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের শান্ত, নির্মল সৌন্দর্য। মনে হয়েছিল, প্রকৃতি এখানে মানুষকে তার সবচেয়ে সুন্দর মুখটি দেখিয়েছে।

আজ সেই একই ভূখণ্ডের ধ্বংসস্তূপের ছবি দেখতে গিয়ে পুরোনো স্মৃতিগুলো বারবার ফিরে আসছে। যে পাহাড়ের সৌন্দর্য ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছিলাম, আজ সেই পাহাড় থেকেই নেমে এসেছে পাথর, বরফ, কাদা আর পানির এক ভয়ংকর স্রোত। যে নদীকে দূর থেকে দেখে মনে হয়েছিল জীবনের অংশ, সেই নদীই এখন বহু পরিবারের কাছে হয়ে উঠেছে শোকের প্রতীক।

প্রকৃতির এই দ্বৈত চরিত্রই হয়তো নেপালের সবচেয়ে গভীর সত্য। এখানে যেমন সৌন্দর্য বিশাল, তেমনি প্রকৃতির শক্তিও নির্মম।

হঠাৎ কেন এমন ভয়াবহ বিপর্যয়?

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, এটি সাধারণ অর্থে শুধু অতিবৃষ্টিজনিত বন্যা ছিল না। নেপাল-চীন সীমান্তের উচ্চ হিমালয় এলাকায় বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে লহেন্দে খোলা নদীর প্রবাহ আটকে দেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সেখানে সাময়িকভাবে পানি ও ধ্বংসাবশেষ জমে একটি অস্থায়ী জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরে সেই বাধা ভেঙে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে আসে এবং ভোতেকোশি নদী হয়ে নিচের জনপদগুলোতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে।

নেপালের আবহাওয়া ও জলবিদ্যা কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণেও বরফধস ও পরবর্তী ধ্বংসাবশেষের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে তদন্ত এখনো চলছে। ফলে এই মুহূর্তে কোনো একটি কারণকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ঘোষণা করা ঠিক হবে না।

তবে একটি বিষয় নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম- হিমালয়ের উচ্চভূমি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হিমবাহ, তুষারস্তর, পাহাড়ের বরফ ও পাথরের স্থিতিশীলতায় পরিবর্তন আনছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, উষ্ণায়ন উচ্চ পর্বতাঞ্চলে বরফ ও শিলার অস্থিতিশীলতা বাড়িয়ে এ ধরনের বিপদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এই নির্দিষ্ট বন্যাটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

এখানেই নেপালের এই বিপর্যয় একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে। হিমালয় শুধু নেপালের নয়। এই পর্বতমালা এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের পানি, কৃষি, জীবিকা ও পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই হিমালয়ের একটি আকস্মিক বিপর্যয় সীমান্তের ভেতরেই থেমে থাকে না। এর প্রভাব নদী, জনপদ, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

শোকের সময়ে বাংলাদেশের পাশে থাকা

নেপালের এই বিপর্যয়ে বাংলাদেশের মানুষও শোকাহত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং দেশটির জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ সরকারও জানিয়েছে, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে ঢাকা প্রস্তুত। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও নেপালের প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞে গভীর শোক জানিয়েছেন।

এটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশেরও কম নয়। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা নদীভাঙনে স্বজন হারানোর বেদনা এ দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানে। তাই নেপালের পাহাড়ে আজ যে কান্না, তার ভাষা বাংলাদেশের মানুষের কাছেও অপরিচিত নয়। দুর্যোগের মুহূর্তে রাষ্ট্রের সীমান্ত থাকে, কিন্তু মানুষের শোকের কোনো সীমান্ত থাকে না।

এভারেস্টের দেশ থেকে সতর্কবার্তা

নেপালকে আমরা চিনি এভারেস্টের দেশ হিসেবে। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের দেশ, পাহাড়ের দেশ, অভিযাত্রী ও পর্যটকের স্বপ্নের দেশ হিসেবে। কিন্তু সেই পাহাড়ের বুকেই লুকিয়ে আছে এক বিরাট ভঙ্গুরতা। প্রকৃতিকে জয় করার মানুষের দীর্ঘদিনের অহংকারের বিপরীতে হিমালয় বারবার মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে জয় করা যায় না; তাকে বুঝতে হয়, তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।

নেপালের এবারের বিপর্যয় তাই শুধু একটি দেশের দুর্যোগ নয়। এটি পাহাড়ি জনপদে বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তা, দুর্যোগ-পূর্ব সতর্কতা, সীমান্তপারের তথ্য আদান-প্রদান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময়ও তৈরি করেছে।

একটি নদী যখন হঠাৎ মৃত্যুর স্রোতে পরিণত হয়, তখন শুধু নদীকে দায়ী করলে চলে না। আমাদের জানতে হবে- কেন আগাম সতর্কতা পৌঁছাল না, কেন মানুষ নিরাপদে সরে যাওয়ার পর্যাপ্ত সময় পেল না, কীভাবে পাহাড়ি অবকাঠামোকে আরও স্থিতিস্থাপক করা যায় এবং সীমান্তের দুই পাশে কীভাবে দ্রুত তথ্য ভাগাভাগি করা যায়।

এভারেস্টের দেশ বহুবার তার সৌন্দর্য দিয়ে পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছে। এবার তার কান্না যেন বিশ্বকে আরও বড় কোনো বিপর্যয়ের আগে সতর্ক করে। কারণ পাহাড় নীরব থাকতে পারে, নদীও দূর থেকে শান্ত দেখাতে পারে। কিন্তু তাদের নীরবতার ভেতর যে শক্তি জমে থাকে, তার কাছে মানুষের অহংকার খুবই ক্ষুদ্র।

আজ নেপালের পাহাড়ে তাই শুধু শোক নয়, একটি প্রশ্নও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- প্রকৃতির শক্তিকে আমরা কি সত্যিই বুঝতে শিখেছি?



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: