২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার চূড়ান্ত সময়সূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রস্তুতির সময়সীমা এখন স্পষ্ট হয়েছে। আগামী বছরের ১৪ মার্চ বাংলা প্রথম পত্রের মাধ্যমে শুরু হয়ে তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হবে ১৫ এপ্রিল। এর আগে ৭ জানুয়ারি পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্ত থাকলেও তা পরিবর্তন করে মধ্য-মার্চে নেওয়া হয়েছে। সময়সূচির এই পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দিয়েছে- এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই বাড়তি সময় যেন বাড়তি মানসিক চাপের সময় হয়ে না ওঠে, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কারণ আমাদের সামনে ইতিমধ্যে সতর্কসংকেত আছে। ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০। ২০২৫ সালের ৪০৩ জনের মধ্যে ১৯০ জনই ছিল স্কুলশিক্ষার্থী- মোট ঘটনার ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ যে বয়সে একজন শিশু-কিশোরের আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন তৈরি হওয়ার কথা, সেই বয়সেই এত বিপজ্জনক সংখ্যক শিক্ষার্থী জীবন হারাচ্ছে। সমীক্ষাটি ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে, ফলে এটাকে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, বরং সংকটের একটি দৃশ্যমান সূচক হিসেবে দেখা উচিত।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই আত্মহত্যাগুলোর সঙ্গে মানসিক যন্ত্রণা ও একাডেমিক চাপের সম্পর্ক স্পষ্ট। আঁচল ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণে প্রায় ২৮ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে বিষণ্নতা এবং ২৩ শতাংশের সঙ্গে অভিমান বা তীব্র আবেগগত সংকটের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। অন্য এক প্রতিবেদনে সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ৭২টি আত্মহত্যার ঘটনায় একাডেমিক চাপের বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ পরীক্ষা, ফলাফল ও পড়াশোনাকে ঘিরে তৈরি চাপকে আমরা নিছক ‘পড়াশোনার চাপ’ বলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি না। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি আত্মমর্যাদা, পারিবারিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ- সবকিছুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
সাম্প্রতিক ঘটনাই সেই আশঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে অন্তত ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে বলে আঁচল ফাউন্ডেশন জানিয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজন মেয়ে ও তিনজন ছেলে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কয়েকজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর তীব্র মানসিক সংকটের কথা পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
তবে একটি বিষয় এখানে পরিষ্কারভাবে বলা জরুরি: আত্মহত্যা কখনো একটি মাত্র কারণে ঘটে না। পরীক্ষায় খারাপ ফল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিষণ্নতা, সম্পর্কের সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, নির্যাতন, বুলিং- বিভিন্ন ঝুঁকি একসঙ্গে কাজ করতে পারে। তাই শুধু পরীক্ষার ফল বা অভিভাবকের চাপকে একক কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন বৈজ্ঞানিকভাবে যথাযথ নয়, তেমনি একাডেমিক চাপকে গুরুত্বহীন ভাবাও বিপজ্জনক।
বাংলাদেশের কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণাও আমাদের স্বস্তি দেওয়ার মতো নয়। ঢাকার ১৩ - ১৮ বছর বয়সী ৫৬৩ জন স্কুলশিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার বিষণ্নতার হার ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং উদ্বেগের হার ১৮ দশমিক ১ শতাংশ পাওয়া গিয়েছিল। আর ২০২১ সালে দেশের ৬৩ জেলার ৩,৫৭১ স্কুলশিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্নতার হার ৩৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং উদ্বেগের হার ২১ দশমিক ৭ শতাংশ পাওয়া গেছে। গবেষণাগুলো থেকে একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট- পরীক্ষার চাপকে কিশোর বয়সীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বৃহত্তর বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাও কৈশোরকে মানসিক বিকাশের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময় হিসেবে চিহ্নিত করে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ১০ - ১৯ বছর বয়সী প্রতি সাতজন কিশোর-কিশোরীর প্রায় একজন কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার সঙ্গে বসবাস করে, এই বয়সে উদ্বেগ ও বিষণ্নতা মানসিক সমস্যার বড় অংশ। তাই একজন পরীক্ষার্থীকে শুধু ‘আরও পড়তে হবে’, ‘আরও নম্বর পেতে হবে’- এই ভাষায় দেখলে তার মানুষ হিসেবে প্রয়োজনীয়তাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়।
আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বড় সমস্যা এখানেই। আমরা অনেক সময় একটি পরীক্ষাকে একজন শিশুর মেধার চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখি। সন্তান কত নম্বর পেল, পাশ করল কিনা, জিপিএ-৫ পেল কিনা- এসব যেন তার যোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড। আত্মীয়ের সন্তান কত পেয়েছে, পাশের বাসার ছেলে কত পেল, সন্তানের বন্ধু কোন কলেজে যাবে- এসব তুলনা করে আমরা সন্তানের সামনে এমন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা তৈরি করি, যার শেষ কোথায় সে নিজেও জানে না।
অভিভাবকের একটি বাক্যই কখনো কখনো সেই চাপকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে- ‘তোমাকে জিপিএ-৫ পেতেই হবে।’ অথচ সন্তানের কাছে একই কথা যদি বলা হয়, ‘তুমি তোমার সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করো, ফল যা-ই হোক আমরা তোমার পাশে আছি’, তাহলে পরীক্ষার অর্থই বদলে যায়। প্রথম বাক্য পরীক্ষাকে সন্তানের কাছে বিচারসভায় পরিণত করে, দ্বিতীয়টি পরীক্ষাকে পরিণত করে শেখার ধাপে।
সুতরাং ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে অভিভাবকদের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত চাপ কমানো, যোগাযোগ বাড়ানো। সন্তানের পড়াশোনার অগ্রগতি অবশ্যই দেখতে হবে, কিন্তু প্রতিদিন শুধু কত ঘণ্টা পড়েছে বা মডেল টেস্টে কত নম্বর পেয়েছে তা জানতে চাওয়া যথেষ্ট নয়। সে কেমন আছে, কী নিয়ে ভয় পাচ্ছে, কোন বিষয়টি বুঝতে পারছে না, কোনো বন্ধুত্ব বা পারিবারিক সমস্যায় কষ্ট পাচ্ছে কিনা- এসব ব্যাপারেও জানতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তুলনা বন্ধ করতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার গতি, আগ্রহ, মেধা ও সক্ষমতা আলাদা। অন্যের ফলাফলকে নিজের সন্তানের জন্য মানদণ্ড বানানো তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে কৈশোরে আত্মমর্যাদা অত্যন্ত ভঙ্গুর থাকে। ব্যর্থতার অনুভূতিকে যদি পরিবারের প্রত্যাখ্যানের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সংকট আরও গভীর হতে পারে।
তৃতীয়ত, পড়াশোনার পাশাপাশি ঘুম, বিশ্রাম, খেলাধুলা, বিনোদন ও বন্ধুদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগের সুযোগ রাখতে হবে। পরীক্ষার প্রস্তুতি মানে সন্তানকে সারাক্ষণ বইয়ের সামনে বসিয়ে রাখা নয়। বরং পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগ মানসিক সুস্থতারই অংশ। ইউনিসেফও শিশু ও কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে পরিবার, বিদ্যালয় ও সম্প্রদায়ের সহায়ক পরিবেশের গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছে। বাংলাদেশে বিদ্যালয়ভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সহায়তা কার্যক্রম নিয়েও কাজ হয়েছে।
চতুর্থত, সন্তানের আচরণে পরিবর্তনকে ‘নাটক’ বা ‘অভিনয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, অতিরিক্ত চুপচাপ থাকা, ঘুম বা খাওয়ার অভ্যাসে বড় পরিবর্তন, অস্বাভাবিক ভয়, পড়াশোনায় আকস্মিক অনীহা, বারবার নিজেকে ব্যর্থ বা মূল্যহীন মনে করার কথা বলা- এসব সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষক, কাউন্সেলর, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা অন্য কোনো মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সাহায্য নিতে হবে। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়, বরং সময়মতো সাহায্য চাওয়া একজন সন্তানের জীবন রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সন্তানকে বোঝাতে হবে- ফলাফল খারাপ হলেও সে পরিবারের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে না। পরীক্ষায় ব্যর্থতা জীবনের একটি ঘটনা, জীবন নিজে কোনো পরীক্ষা নয় যার ফলাফল একটি মার্কশিটে লেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী একটি বিষয়ে ফেল করতে পারে, কাঙ্ক্ষিত জিপিএ নাও পেতে পারে, পছন্দের কলেজে ভর্তি নাও হতে পারে- কিন্তু সেখান থেকে জীবনের নতুন পথ তৈরি করার অসংখ্য সুযোগ থাকে।
২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের হাতে যে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হয়েছে, সেটা তাই শুধু আরও বেশি পড়ানোর সুযোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এই সময় হতে পারে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার সময়, তার দুর্বল জায়গাগুলো বুঝে পাশে দাঁড়ানোর সময় এবং সবচেয়ে বড় কথা- তাকে বোঝানোর সময় যে তার মূল্য কোনো পরীক্ষার নম্বরের চেয়ে অনেক বেশি।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য যদি সত্যিই মানুষ তৈরি করা হয়, তাহলে সেই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্বও আমাদের নিতে হবে। জিপিএ-৫ ভালো, ভালো ফলাফলও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো নম্বরই সন্তানের জীবনের চেয়ে বড় নয়। পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগে প্রত্যেক শিক্ষার্থী যেন অন্তত এই নিশ্চয়তাটি নিয়ে যেতে পারে- ‘আমি ভালো করলে আমার পরিবার খুশি হবে, কিন্তু আমি খারাপ করলেও তারা আমাকে ছেড়ে যাবে না।’
এই নিরাপত্তাবোধই হবে সন্তানের জন্য পরীক্ষার সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি। আর ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার আগে বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারে এই একটি বার্তাই সবচেয়ে বেশি পৌঁছানো জরুরি যে, জিপিএ নয়, সন্তানের জীবনই প্রথম।