প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নয়াদিল্লিতে নিতে আগ্রহ দেখিয়ে আসছে ভারত। আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ থেকে শুরু করে কূটনৈতিক যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই সফরটি নিয়ে দিল্লির আগ্রহ স্পষ্ট। তবে এখনো ভারত সফরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগের মধ্যেই সম্ভাব্য এই সফরকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। বিশেষ করে ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর দাবি সফরের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন তারেক রহমানকে দিল্লিতে চায় ভারত?
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবেই তারেক রহমানের সফরকে দেখছে দিল্লি।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করলে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক তৈরির উদ্যোগ নেয় ভারত।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পক্ষ থেকে তাকে দিল্লি সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা ঢাকায় এসে সেই আমন্ত্রণপত্র তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন।
এরপর থেকেই ভারতীয় কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সফরটি নিয়ে একাধিকবার ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। দিল্লি জানিয়েছে, ভারত সফরে গেলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হবে।
বাংলাদেশের গুরুত্ব কোথায়?
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত এবং বছরে ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাণিজ্য।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌ যোগাযোগের পাশাপাশি নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাড়ে।
তবে বাংলাদেশে এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও ছিল। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, ভারত বাংলাদেশের জনগণের চেয়ে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
তাই শেখ হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তোলা দিল্লির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সফরে কেন দ্বিধায় ঢাকা?
সফরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অস্বস্তির জায়গা শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান।
২০২৪ সালের আন্দোলনে প্রাণহানি ও দমন-পীড়নের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে।
তবে শেখ হাসিনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ তারা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।
এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনা একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে ওঠে। ঢাকা এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছে, ভারতের মাটি থেকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ভারত অবশ্য জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনের সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যকেও তারা সমর্থন করে না।
ঢাকার শর্ত কী?
শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশ স্পষ্ট করে দেয়, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে একটি অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন।
ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতকে শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক ব্যক্তিকে ফেরানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে আলোচিত শরীফ ওসমান হাদী হত্যা মামলার সন্দেহভাজনদের হস্তান্তরের দাবিও জানানো হয়েছে।
১০ আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকেও এসব বিষয় আলোচনায় আসে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
পরে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার জন্য দিল্লিতে ফিরে যান ভারতীয় হাইকমিশনার এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ঢাকার অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করেন।
সফরের প্রস্তুতি কতদূর এগিয়েছিল?
আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক মহলে বেশ তৎপরতা দেখা যায়। ২২ বা ২৩ আগস্ট সফরের সম্ভাব্য সময় হিসেবে আলোচনায় ছিল।
সফরে জ্বালানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি বণ্টন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিষয় আলোচনায় আসতে পারে বলেও ধারণা করা হয়েছিল।
তবে দুই দেশের কোনো সরকারই আনুষ্ঠানিকভাবে সফরের তারিখ ঘোষণা করেনি।
২১ আগস্ট ভারতের রাষ্ট্রপতি ভবনের একটি বার্তা পরিস্থিতিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। সেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার মহড়ার কারণে নিয়মিত ‘চেঞ্জ অব গার্ড’ অনুষ্ঠান বাতিলের কথা বলা হয়েছিল। পরে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বার্তাটি সরিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব জানান, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি এবং ঢাকা শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের বিষয়ে ভারতের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
আমন্ত্রণ কি শুধু একটিই?
না। তারেক রহমানের সামনে ভারতের দুটি আমন্ত্রণ রয়েছে।
প্রথমটি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর নরেন্দ্র মোদীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ। দ্বিতীয়টি ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস আউটরিচ সেশনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ।
ভারত জানিয়েছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বিমসটেকের সভাপতিত্ব করছে বলেই তাকে ব্রিকসের ওই আয়োজনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটি সরাসরি দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ নয়।
দুটি আমন্ত্রণের রাজনৈতিক গুরুত্বও আলাদা। বহুপক্ষীয় আয়োজনে অংশ নেওয়া আর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের জন্য দিল্লি সফর—দুই বিষয়কে একইভাবে দেখা হয় না।
ভারতের আগ্রহ এখন আরও বেশি কেন?
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি চীনের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা বেড়েছে।
এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত ‘মক্কা ডিফেন্স প্যাক্ট’-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এসব পদক্ষেপের অর্থ বাংলাদেশ ভারতবিরোধী কোনো জোটে চলে যাচ্ছে—এমন নয়। তবে দিল্লির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ হাসিনা সরকারের সময় বাংলাদেশের ওপর ভারতের যে ধরনের প্রভাব ছিল, এখন সেটি আর একইভাবে নিশ্চিত নয়।
তাই আঞ্চলিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার আগেই তারেক রহমানের সরকারের সঙ্গে শক্তিশালী ও সরাসরি সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছে ভারত।
তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ
ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং বাণিজ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগের বড় অংশীদার। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন ও গঙ্গার পানি চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও দুই দেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ দাবি উপেক্ষা করে সরাসরি দিল্লি সফর করলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেটি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নিজেদের পররাষ্ট্রনীতিকে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির আলোকে তুলে ধরছে। সেখানে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় মর্যাদা, পারস্পরিক স্বার্থ ও অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
ফলে সম্ভাব্য ভারত সফরে শুধু বৈঠক বা কূটনৈতিক বার্তাই নয়, সফরের সময়, আনুষ্ঠানিকতা এবং শেখ হাসিনা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান, সবকিছুই ঢাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত কী হতে পারে?
দিল্লির কাছে তারেক রহমানের ভারত সফর ২০২৪-পরবর্তী সম্পর্কের বরফ গলানোর একটি বড় প্রতীক হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রক্রিয়ায় জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থান কতটা অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।
দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে জমে থাকা একাধিক অমীমাংসিত ইস্যু। বিশেষ করে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়ে ঢাকার দ্বিধা পুরোপুরি কাটবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম