ডিপ্রেশনকে আমরা এখনো অনেক সময় বলি ‘মন খারাপ’। কেউ দীর্ঘদিন চুপচাপ থাকলে বলি, ‘সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে।’ পরীক্ষায় খারাপ করলে বলি, ‘এতটুকু ব্যাপারে মন খারাপ করার কী আছে?’ চাকরি না পেলে বলি, ‘চেষ্টা করলেই হবে।’ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক ভেঙে গেলে বলি, ‘সবাই তো এসবের মধ্য দিয়ে যায়।’ বৃদ্ধ মানুষটি সারাদিন একা থাকলে বলি, ‘বয়স হয়েছে, এমন তো হবেই।’
এই কথাগুলো শুনতে স্বাভাবিক। কিন্তু সব সময় স্বাভাবিক নয়। কারণ দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা, কোনো কিছুতে আনন্দ না পাওয়া, ঘুম ও খাওয়ার বড় পরিবর্তন, অসহ্য ক্লান্তি, নিজেকে মূল্যহীন মনে হওয়া কিংবা মৃত্যুর কথা ভাবা- এসবকে শুধু ‘মন খারাপ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। ডিপ্রেশন একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা; চরিত্রের দুর্বলতা নয়।
বাংলাদেশে সমস্যাটির ব্যাপ্তি কম নয়। ২০১৮ - ১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে ১৮- ৯৯ বছর বয়সী মানুষের ৬.৭ শতাংশের depressive disorder পাওয়া যায়। একই জরিপে ১৮ - ৯৯ বছর বয়সীদের ১৬.৮ শতাংশের কোনো না কোনো মানসিক রোগ ছিল। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মানসিক সমস্যার উপস্থিতি উদ্বেগজনক। ৭ - ১৭ বছর বয়সীদের ১৩.৬ শতাংশের কোনো মানসিক রোগ পাওয়া যায়। কিন্তু আক্রান্তদের চিকিৎসা পাওয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ- ৯২.৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং ৯৪.৫ শতাংশ শিশু-কিশোর কোনো চিকিৎসা নেয়নি।
অর্থাৎ সমস্যা দুটো। একদিকে ডিপ্রেশন আছে; অন্যদিকে আমরা সেটাকে যথেষ্ট শনাক্তই করছি না।
কিশোরদের একটি জাতীয় গবেষণায় ৯,৫৬৯ জনের মধ্যে ২৪.৫২ শতাংশের কোনো মাত্রার depression পাওয়া গেছে- মেয়েদের ক্ষেত্রে ২৭.০১ শতাংশ, ছেলেদের ২২.০২ শতাংশ। এখানে মৃদু থেকে গুরুতর সব মাত্রা অন্তর্ভুক্ত। এই তথ্যকে clinical depression-এর জাতীয় হার বলা যাবে না, কিন্তু কিশোরদের মানসিক চাপের ব্যাপ্তি বোঝার জন্য এটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও পারিবারিক-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও এসব উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ডিপ্রেশন শুধু বড়দের সমস্যা নয়। বাবা-মায়ের অশান্তি, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, বুলিং, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা- শিশু-কিশোরের জীবনেও এমন চাপ আছে, যা আমরা অনেক সময় গুরুত্ব দিই না। সে চুপ হয়ে গেলে বলি ‘বদমেজাজ’; পড়াশোনায় মন না বসলে বলি ‘অমনোযোগী’; ঘরে থাকতে চাইলে বলি ‘অলস’। অথচ আচরণের এই পরিবর্তন কখনো কখনো সাহায্যের প্রয়োজনের সংকেত হতে পারে।
তরুণদের সমস্যার ধরন আবার ভিন্ন। শিক্ষা শেষ করে চাকরি না পাওয়া, দীর্ঘ বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সম্পর্কের ভাঙন, পরিবার থেকে প্রত্যাশার চাপ- সব মিলিয়ে একটি বয়স, যে বয়সটিকে আমরা শুধু ‘জীবন গড়ার সময়’ হিসেবে দেখি। অথচ এই সময়েই অনেকের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় তথ্যেও আর্থসামাজিক বাস্তবতার ছাপ আছে। বেকারত্ব, কম শিক্ষাগত অর্জন, বৈবাহিক বিচ্ছেদ বা একাকিত্ব এবং পরিবারে মানসিক অসুস্থতার ইতিহাসের সঙ্গে depression-এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে। নারীদের ঝুঁকিও পুরুষের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ ডিপ্রেশনকে শুধু ‘মস্তিষ্কের রাসায়নিক সমস্যা’ হিসেবে দেখলে মানুষের বাস্তব জীবনটিই বাদ পড়ে যায়।
বাবা-মায়ের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সংসার চালানোর চাপ, আর্থিক সংকট, দাম্পত্য সমস্যা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ, কর্মক্ষেত্রের চাপ কিংবা দীর্ঘদিনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। পরিবারের কারও ডিপ্রেশনের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কিন্তু পারিবারিক ইতিহাস মানে ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যাওয়া নয়। জেনেটিক প্রবণতা, জীবন-অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ- সব মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি হয়।
আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। অবসর, আয় কমে যাওয়া, প্রিয়জন হারানো, সন্তানদের দূরে চলে যাওয়া, একাকিত্ব ও দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা প্রবীণদের বিষণ্ন করে তুলতে পারে। জাতীয় জরিপে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে কোনো না কোনো মানসিক রোগের হার ২৮.১ শতাংশ, যা ১৮ - ২৯ বছর বয়সীদের ১৪.৬ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। এটি depression-এর বয়সভিত্তিক হার নয়, কিন্তু প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের বড় ঝুঁকির ইঙ্গিত অবশ্যই।
ডিপ্রেশন কেন হয়?
এর কোনো একক উত্তর নেই। জেনেটিক প্রবণতা থাকতে পারে; মস্তিষ্কের জৈবিক প্রক্রিয়া ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী চাপ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নির্যাতন, সম্পর্কের সংকট, প্রিয়জন হারানো, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা জীবনের বড় কোনো আঘাতও ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক অসুস্থতা ও কিছু ওষুধও বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তাই ডিপ্রেশনে আক্রান্ত মানুষকে ‘নিজেকে সামলাও’ বলা যথেষ্ট নয়। যে মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সামলাতে পারছেন না, তার প্রয়োজন হয়তো আরও বেশি উপদেশ নয়- প্রয়োজন সাহায্য।
কারণ ক্ষতিটিও গভীর। ডিপ্রেশন মানুষের পড়াশোনা ও কর্মক্ষমতা কমায়, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল করে, দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে। গুরুতর অবস্থায় আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রতি বছর লাখ লাখ মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়; ১৫ - ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। ফলে ডিপ্রেশনকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার বাইরে পড়ে থাকা মানুষগুলো। ২০২৬ সালে প্রকাশিত জাতীয় গবেষণায় বর্তমান depressive disorder-এর হার ৫.২ শতাংশ পাওয়া গেছে; কিন্তু আক্রান্তদের মাত্র ৪.১ শতাংশ পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন। অর্থাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষ সমস্যাটি নিয়ে বেঁচে আছেন, কিন্তু চিকিৎসার আওতায় আসছেন না।
কী করতে হবে?
প্রথম কাজ পরিবারকে বদলাতে হবে। ছেলে চুপ হয়ে গেলে, মেয়ের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে, বাবা-মা দীর্ঘদিন বিষণ্ন থাকলে কিংবা বৃদ্ধ মানুষটি নিজেকে গুটিয়ে নিলে ‘এটা কিছু না’ বলা যাবে না। প্রথম কাজ হলো শোনা, বিচার না করা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া।
দ্বিতীয় কাজ স্কুল-কলেজে। মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কাউন্সেলিংকে বিলাসিতা হিসেবে দেখা যাবে না। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে শিশুকে অপমান না করে তার মানসিক অবস্থাও জানতে হবে। বুলিং, পারিবারিক সহিংসতা, একাকিত্ব বা আত্মহানির চিন্তার মতো বিষয় শনাক্ত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তৃতীয় কাজ প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। প্রতিটি উপজেলা পর্যায়ে depression শনাক্তকরণ, প্রাথমিক কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং referral-এর ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারণ প্রতিটি রোগীকে ঢাকায় বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো বাস্তবসম্মত নয়।
চতুর্থ কাজ প্রবীণদের জন্য। একাকিত্ব ও বিষণ্নতাকে বার্ধক্যের অবধারিত অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং নিয়মিত screening-এর ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
আর রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি কাজ- নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ। বাংলাদেশে কোন বয়সে depression কত, কোন অঞ্চলে বেশি, নারী-পুরুষের পার্থক্য কী, দরিদ্র ও বেকার মানুষের ঝুঁকি কত, কতজন চিকিৎসা পাচ্ছেন- এসবের নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত জাতীয় তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি করা কঠিন।
আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যনীতিতে পরিকল্পনা আছে। এখন দরকার বাস্তবায়ন, জনবল, অর্থায়ন এবং জবাবদিহি।
ডিপ্রেশনকে শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একজন শিশু, একজন তরুণ, একজন মা, একজন বাবা কিংবা একজন প্রবীণ ব্যাক্তি- যে বয়সেই হোক, দীর্ঘদিনের বিষণ্নতা তার নিজের জীবন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত করে, তেমনি পরিবার ও সমাজের ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
‘মন খারাপ’ বলে আমরা যদি ডিপ্রেশনকে লুকিয়ে রাখি, তাহলে মানুষটি সুস্থ হবে না, শুধু তার কষ্টটি আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যাবে।
বাংলাদেশে এখন এমন একটি মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে মানুষ ডিপ্রেশনে পড়ার পর একা লড়বে না- পরিবার তাকে শুনবে, চিকিৎসাব্যবস্থা তাকে গ্রহণ করবে এবং রাষ্ট্র তাকে গুরুত্ব দেবে।