মামলা মাথায়, তবু মিছিলে সক্রিয়—অর্ণব রায় কি আইনের ঊর্ধ্বে?

অনলাইন ডেস্ক

মতামত

আইন কি সবার জন্য সমান? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর আইনে মামলা

2026-09-03T19:46:37+00:00
2026-09-03T19:46:37+00:00
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
মামলা মাথায়, তবু মিছিলে সক্রিয়—অর্ণব রায় কি আইনের ঊর্ধ্বে?
—তরিকুল ইসলাম
অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৪৬ পিএম 
তরিকুল ইসলাম
আইন কি সবার জন্য সমান? বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর আইনে মামলা থাকার অভিযোগের মধ্যেও তাকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে সক্রিয় দেখা যাওয়ার দাবি ওঠে, তখন প্রশ্নটি আরও গভীর হয়। তখন শুধু একজন ব্যক্তির কর্মকাণ্ড নয়, প্রশ্নের মুখে পড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা, তদন্তের অগ্রগতি এবং রাষ্ট্রের আইনের শাসন।

শেরপুরের নকলা উপজেলার অর্ণব রায়কে ঘিরে সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। নকলা থানায় দায়ের হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় তাঁর নাম আসামি হিসেবে রয়েছে। মামলার বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, মামলা হওয়ার দীর্ঘ সময় পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। শুধু তাই নয়, তাঁকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে অংশ নিতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো—যদি কোনো মামলার আসামি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারেন, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখে বিষয়টি আসে না কেন? আর যদি আসে, তাহলে আইনগত প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?

এখানে কেউ অপরাধী কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। মামলায় আসামি হওয়া মানেই দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়—এই নীতি অবশ্যই মানতে হবে। কিন্তু সেই নীতির অর্থ এই নয় যে মামলা দায়ের হওয়ার পর তদন্ত বছরের পর বছর স্থবির থাকবে, আসামিদের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ থাকবে না এবং সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করলেও কোনো জবাবদিহি থাকবে না।

অর্ণব রায়ের সমর্থকদের একটি অংশ তাঁকে সাহসী ও সক্রিয় সংগঠক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। তাঁরা বলতে পারেন, কোনো আনুষ্ঠানিক পদ-পদবি ছাড়াই তিনি রাজনৈতিক কর্মীদের সংগঠিত করেছেন এবং কঠিন সময়ে মাঠে থেকেছেন। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—রাজনৈতিক সাহসের সংজ্ঞা কী?

আইনের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন থাকলে আইনগত প্রক্রিয়ার প্রতি সম্মান দেখানো কি রাজনৈতিক দায়িত্বের অংশ নয়?

একজন ব্যক্তি যতই সাহসী, জনপ্রিয় বা সংগঠক হিসেবে পরিচিত হোন না কেন, আইনের প্রশ্নে তাঁর জন্য আলাদা কোনো মানদণ্ড থাকতে পারে না। বরং যারা নিজেদের রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল বলে দাবি করেন, তাঁদের কাছ থেকেই আইনের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রত্যাশিত।

অর্ণব রায়কে ঘিরে অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো রাজনৈতিক সক্রিয়তার ধারাবাহিকতা। মামলার বাদীর দাবি অনুযায়ী, তিনি নিষ্ক্রিয় নন; বরং বিভিন্ন কর্মসূচিতে উপস্থিত রয়েছেন। যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা অত্যন্ত জরুরি—একজন মামলার আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কেন তাঁর বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়?

রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা কখনোই এমন ধারণা তৈরি করতে পারে না যে, প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কেউ আইনের বাইরে থেকে যেতে পারেন। কারণ এই ধারণাই ধীরে ধীরে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে।

একজন সাধারণ মানুষ সামান্য অভিযোগে থানায় গেলে তাকে দিনের পর দিন আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। অথচ কোনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর আইনে মামলা থাকার পরও যদি তাঁকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়—এমন অভিযোগ ওঠে—তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে: আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান?

এখানে অর্ণব রায়ের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা তাঁর সাংগঠনিক সক্ষমতা কোনো উত্তর নয়। বরং এসব প্রশ্ন আরও জোরালো করে। কারণ রাজনৈতিক পরিচিতি যদি একজন ব্যক্তিকে আইনের জবাবদিহির প্রশ্ন থেকে দূরে রাখার সুযোগ দেয়, তাহলে সেটি ব্যক্তি নয়, পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যই বিপজ্জনক বার্তা।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনীতিতে অনেক সময় ব্যক্তিকে ‘সাহসী’ প্রমাণ করার জন্য এমন কর্মকাণ্ডকে মহিমান্বিত করা হয়, যার আইনি ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন থাকে। দলীয় পদ-পদবি না থাকলেও কেউ আলোচিত হতে পারেন—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু আলোচিত হওয়ার সঙ্গে জবাবদিহির প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

সাহস যদি হয় আইনকে উপেক্ষা করে এগিয়ে চলা, তাহলে সেটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ইতিবাচক উদাহরণ হতে পারে না।

অর্ণব রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগ সত্য হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি না থাকলে সেটিও স্পষ্ট করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য বিষয় হবে—মামলাটি অনিশ্চয়তার মধ্যে রেখে বছরের পর বছর কোনো কার্যকর সিদ্ধান্তে না পৌঁছানো।

নকলা থানার বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলার নথি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। এখন জনগণ দেখতে চায়, সেই ব্যবস্থা কেবল বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তব তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামনে আসে।

অর্ণব রায়কে ঘিরে আলোচনার শেষ কথা হওয়া উচিত একটাই—রাজনৈতিক সক্রিয়তা কখনোই আইনি জবাবদিহির বিকল্প নয়।

তিনি কোনো দলের কর্মী হোন, আলোচিত সংগঠক হোন কিংবা পদ-পদবিহীন সক্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তি হোন—আইনের কাছে তাঁর পরিচয় একটাই: একজন নাগরিক। আর একজন নাগরিক হিসেবে তাঁর অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি আইনি দায়বদ্ধতাও রয়েছে।

রাষ্ট্রের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার—আইন কারও রাজনৈতিক পরিচয় দেখে চলে না। মামলা থাকলে তদন্ত হবে, অভিযোগ থাকলে যাচাই হবে এবং প্রমাণ থাকলে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

কারণ অর্ণব রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঠিক বা ভুল প্রমাণের চেয়েও বড় প্রশ্ন এখন আইনের শাসন।

একজন মামলার আসামি বলে অভিযোগ থাকা ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকার অভিযোগের পরও কোনো দৃশ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি না হন, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন করবেই—আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি কারও কারও জন্য আইন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ?

সাংবাদিক ও কলামিস্ট, মোবাইল: ০১৭১৫২৬১৮২৭, ই-মেইল: [email protected]


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: