শিশুর রক্তে সীসা: বিষে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী

অনলাইন ডেস্ক

মতামত

শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছরেই মস্তিষ্কের ৮০ শতাংশের বেশি বিকাশ ঘটে- এই সময়ে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে এক মিলিয়নেরও বেশি নতুন

2026-08-31T17:51:59+00:00
2026-08-31T17:51:59+00:00
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
শিশুর রক্তে সীসা: বিষে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী
দীপু মাহমুদ
অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ৩১ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৫১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
শিশুর জীবনের প্রথম তিন বছরেই মস্তিষ্কের ৮০ শতাংশের বেশি বিকাশ ঘটে- এই সময়ে প্রতি সেকেন্ডে গড়ে এক মিলিয়নেরও বেশি নতুন নিউরাল সংযোগ তৈরি হয়। এরপরও বিকাশ থেমে যায় না, পাঁচ বছর বয়সে মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়স্ক মস্তিষ্কের প্রায় ৯০ শতাংশ আকারে পৌঁছে যায়। তাই জন্মের পরের প্রথম পাঁচ বছর শিশুর মস্তিষ্ক গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়- পুষ্টি, নিরাপত্তা, ভালোবাসা, খেলাধুলা, কথা বলা ও শেখার সুযোগ যেমন এই বিকাশকে শক্ত ভিত দেয়, তেমনি অপুষ্টি, অবহেলা, বিষাক্ত পরিবেশ বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সেই ভিত দুর্বল করে দিতে পারে। 

অর্থাৎ শিশু জন্মের পর প্রথম কয়েক বছর পৃথিবীকে চিনতে শেখে- শব্দ শুনে, ছবি দেখে, খেলতে খেলতে, হাত দিয়ে জিনিস ছুঁয়ে, প্রশ্ন করতে করতে। এই সময়টিই তার মস্তিষ্কের দ্রুততম বিকাশের সময়। অথচ বাংলাদেশের লাখ লাখ শিশু এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে এমন এক বিষাক্ত ধাতুর সংস্পর্শে আসছে, যা চোখে দেখা যায় না, গন্ধ পাওয়া যায় না, অথচ ধীরে ধীরে তার মস্তিষ্ক, শেখার ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সেটা হচ্ছে সীসা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক জাতীয় তথ্য এ সংকটকে আর অনুমানের জায়গায় রাখেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও UNICEF-এর MICS 2025-এ দেখা গেছে, ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ৩৮.৩৪ শতাংশ শিশুর রক্তে সীসার মাত্রা ৫ µg/dL বা তার বেশি। জাতীয় পর্যায়ে প্রথমবারের মতো এত বড় পরিসরে শিশুদের রক্তে সীসা পরীক্ষা করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।  অর্থাৎ বিষয়টি কোনো নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল, বস্তি কিংবা দরিদ্র পরিবারের সমস্যা নয়, এটা এখন জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ঢাকার চিত্র সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। icddr,b ও Stanford University-এর ২০২২ - ২০২৪ সালের গবেষণায় ২ - ৪ বছর বয়সী ৫০০ শিশুর প্রত্যেকের রক্তে সীসা পাওয়া গেছে এবং ৯৮ শতাংশের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল। শিল্পকারখানা ও ব্যাটারি-সংশ্লিষ্ট স্থাপনার এক কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী শিশুদের রক্তে সীসার মাত্রা পাঁচ কিলোমিটারের বেশি দূরে থাকা শিশুদের তুলনায় ৪৩ শতাংশ বেশি।  অর্থাৎ আমরা যে শহর গড়ে তুলেছি, তার কিছু অংশে শিশুর বাড়ির কাছাকাছিই বিষের কারখানা বসিয়ে দিয়েছি।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, সীসা বিষক্রিয়া অনেক সময় কোনো দৃশ্যমান অসুস্থতা তৈরি করে না। শিশু হয়তো খেলছে, স্কুলে যাচ্ছে, হাসছে- অভিভাবকের চোখে সে সুস্থ। কিন্তু তার রক্তে ঢুকে পড়া সীসা মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। WHO বলছে, সীসার কোনো নিরাপদ মাত্রা জানা নেই; এমনকি ৩.৫ µg/dL-এর মতো নিম্ন মাত্রাও কম IQ, মনোযোগের সমস্যা ও শেখার সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। 

এখানেই সংকট শুধু আর স্বাস্থ্য সংকট থাকে না, এটা হয়ে ওঠে শিক্ষা সংকট এবং মানবসম্পদ সংকট। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রক্তে সীসার মাত্রা ২.৪ থেকে ১০ µg/dL বাড়লে IQ প্রায় ৩.৯ পয়েন্ট কমতে পারে। বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর World Bank ও Lancet Planetary Health-এর মডেলিং বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সীসার কারণে বছরে প্রায় ২ কোটি IQ পয়েন্ট হারাচ্ছে, গড় ক্ষতি প্রতি শিশুর প্রায় ৬.৯ IQ পয়েন্ট। 

এই সংখ্যাটির অর্থ আমাদের বুঝতে হবে। একজন শিশুর IQ কয়েক পয়েন্ট কমে যাওয়া হয়তো পরিবারের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান নয়। কিন্তু কয়েক কোটি শিশুর সামান্য সামান্য সক্ষমতা কমে গেলে একটি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাগত অর্জন, কর্মদক্ষতা, আয় ও উৎপাদনশীলতায় অবশ্যই তার প্রভাব পড়ে। এ কারণেই সীসা দূষণকে শুধু পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিষয় ভাবলে ভুল হবে। এটা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিষয়, স্থানীয় সরকার ও নগর পরিকল্পনার বিষয়- এমনকি অর্থনীতিরও বিষয়।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এর অর্থনৈতিক মূল্য দিচ্ছে। World Bank-এর হিসাবে, শিশুদের IQ ক্ষতির কারণে ভবিষ্যৎ আয়ের ক্ষতির বর্তমান মূল্য ২০১৯ সালে প্রায় ১০.৯ বিলিয়ন ডলার, যা তখনকার GDP-এর ৩.৬ শতাংশের সমান। প্রাপ্তবয়স্কদের হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুসহ সীসার সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ২৮.৬ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ GDP-এর ৬ - ৯ শতাংশ। 

সীসার উৎসও আমাদের অজানা নয়। অনানুষ্ঠানিকভাবে ব্যাটারি ভাঙা ও গলানো, ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পবর্জ্য, সীসাযুক্ত রং, খেলনা, রান্নার পাত্র, প্রসাধনী- এমনকি একসময় রান্নাঘরের অতিপরিচিত হলুদ গুঁড়াও ছিল বড় উৎস।  সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, হলুদে সীসা মেশানোর বিরুদ্ধে গবেষণা, আইন প্রয়োগ ও বাজার নজরদারি চালানোর পর দূষণের হার প্রায় শূন্যে নামানো সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যাটি কঠিন হলেও সমাধান অসম্ভব নয়। 

এখন প্রয়োজন সেই সাফল্যকে জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া। ১৭ আগস্ট সরকার ২০২৬–২০৩৫ সালের Lead-Free Bangladesh জাতীয় কৌশল অনুমোদন করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে শিশুদের রক্তে সীসা ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।  এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু কাগজে লক্ষ্য নির্ধারণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজের বাস্তবায়ন।

প্রথমত, উচ্চঝুঁকির এলাকার শিশুদের ব্যাপক রক্ত-সীসা পরীক্ষা চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাটারি উৎপাদন ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকে অনানুষ্ঠানিক ও আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় আনতে হবে। তৃতীয়ত, শিল্পকারখানা, রং, খেলনা, প্রসাধনী, রান্নার পাত্র ও খাদ্যপণ্যে সীসার উপস্থিতি নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। চতুর্থত, দূষিত মাটি ও শিল্পস্থল শনাক্ত করে দ্রুত পরিষ্কার করতে হবে। পঞ্চমত, শিশুদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সীসা-ঝুঁকি শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় অনুসরণমূলক সেবা যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোকে শুধু ‘সাবধান’ বললে হবে না, তাদের বসবাসের পরিবেশ থেকে বিষের উৎসই সরাতে হবে।

কারণ একজন দুই বছরের শিশুকে বলা যায় না, ‘এই ধুলায় হাত দিয়ো না।’ তাকে বলা যায় না, ‘এই খেলনাটি মুখে দিয়ো না।’ তাকে বলা যায় না, ‘তোমার বাড়ির পাশের ব্যাটারি কারখানার ধোঁয়া থেকে দূরে থাকো।’ শৈশব এমন সতর্কতার বয়স নয়। শিশুকে বিষ থেকে দূরে রাখার দায়িত্ব শিশুর নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের।

বাংলাদেশ শিক্ষা নিয়ে যখন শিখনঘাটতি, ঝরে পড়া, পরীক্ষার ফল ও দক্ষতার সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন, তখন শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশের গোড়াতেই যদি সীসা আঘাত করে, তবে শুধু স্কুলের শ্রেণিকক্ষ দিয়ে সেই সংকট সমাধান করা যাবে না। একজন শিশু কেন পড়া মনে রাখতে পারছে না, মনোযোগ ধরে রাখতে পারছে না কিংবা শেখার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে- তার উত্তর কখনো কখনো বইয়ের পাতায় নয়, তার রক্ত পরীক্ষায় লুকিয়ে থাকতে পারে।

তাই সীসা দূষণ বন্ধ করা কেবল পরিবেশ রক্ষার কর্মসূচি নয়। এটা শিশুর মেধা রক্ষা, শিক্ষার মান রক্ষা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি রক্ষার কর্মসূচি। আজ যে শিশুর রক্তে বিষ ঢুকছে, আগামী দিনের বাংলাদেশ তার মেধা, শ্রম ও সৃজনশীলতার ওপরই দাঁড়াবে। সেই ভবিষ্যৎকে আমরা যদি এখনই রক্ষা না করি, তবে উন্নয়নের অনেক হিসাব ঠিক থাকলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাবটি ভুল হয়ে যাবে- আমরা কেমন মানুষ তৈরি করছি।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: