ছবি ছেঁড়ায় কি ইতিহাস মুছে যায়? ডাকসুর সাম্প্রতিক বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ

মো. সাদ্দাম হোসাইন

মতামত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নবসজ্জিত সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে যে তীব্র উত্তেজনা, ছবি

2026-09-16T12:41:49+00:00
2026-09-16T12:41:49+00:00
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
ছবি ছেঁড়ায় কি ইতিহাস মুছে যায়? ডাকসুর সাম্প্রতিক বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ
মো. সাদ্দাম হোসাইন
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নবসজ্জিত সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে যে তীব্র উত্তেজনা, ছবি ভাঙচুর ও পরস্পরবিরোধী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা আমাদের জাতীয় মনস্তত্ত্বে স্মারক রাজনীতির (Politics of Memory) এক চিরায়ত সংকটকে পুনরায় সামনে এনেছে। আবেগ ও দলীয় বয়ানের চাপে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক আর্কাইভকে রাজনৈতিক মল্লযুদ্ধের ময়দানে পরিণত করার এই প্রবণতা প্রশ্ন তোলে—কোনো চরিত্রকে ইতিহাস থেকে জোরপূর্বক মুছে ফেলার মাধ্যমে কি অতীতের বাস্তবতা বদলানো সম্ভব?

১. স্মারক বনাম দলিল: শ্রদ্ধা জ্ঞাপন নাকি ইতিহাসের পাঠ?

কোনো প্রকাশ্য প্রাঙ্গণে বা দাপ্তরিক দেয়ালে টানানো প্রতিকৃতি কেবল একটি দৃশ্যমান অবয়ব নয়; সমাজ ও রাষ্ট্রের চোখে তা গভীর আদর্শিক শ্রদ্ধাবোধ ও মহিমান্বিতকরণের এক নীরব ঘোষণা। বিপরীতে, একটি অ্যাকাডেমিক আর্কাইভ বা সংগ্রহশালার দেয়াল কোনো শ্রদ্ধার বেদি নয়, বরং সময়ের উত্থান-পতন, রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও জাতির রূপান্তরের এক বস্তুনিষ্ঠ দর্পণ। ফলে সম্মান জানাতে টানানো ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ‘স্মৃতিস্মারক’ আর ঐতিহাসিক কার্যকারণ ব্যাখ্যার জন্য সংরক্ষিত ‘নথি’—এই দুইয়ের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ বিপরীত। যে মুহূর্তে আমরা এই মৌলিক পার্থক্যটুকু গুলিয়ে ফেলি, সেই মুহূর্তেই অ্যাকাডেমিক ইতিহাসচর্চা দলীয় আবেগ আর তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সংঘাতের শিকারে পরিণত হয়।

ডাকসু ভবনে ১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আগমন এবং তাঁকে দেওয়া তৎকালীন ছাত্রসমাজের মানপত্র কোনো মনগড়া গল্প নয়; তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লিখিত অতীত। সেই একই সফরে কার্জন হলে জিন্নাহর ‘উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণার মুখে ছাত্রদের তাৎক্ষণিক ‘No, No’ গর্জনই ছিল বাঙালির স্বাধিকার ও ভাষা আন্দোলনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ। যেখানে আঘাতকারী অনুপস্থিত, সেখানে প্রতিরোধের গৌরবগাথা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। জিন্নাহকে সেখানে কোনো জাতীয় বীর হিসেবে নয়, বরং সেই ঐতিহাসিক পর্বের প্রত্যক্ষ কুশীলব হিসেবে রাখা হয়েছিল। পাঠ্যপুস্তকে জিন্নাহর উদ্ধৃতি থাকলে যদি ক্ষতি না হয়, তবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালায় তাঁর আলোকচিত্র থাকা কোনোভাবেই অপরাধ হতে পারে না।

২. রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মেরুকরণ ও অযৌক্তিক বিতর্ক

সংগ্রহশালার কিউরেটোরিয়াল উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে ছবি দেখেই সেটিকে ‘পাকিস্তানপ্রেম’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবমাননা’ হিসেবে দেগে দেওয়া একটি পরিকল্পিত ও স্থূল রাজনৈতিক বয়ান।

●তাৎক্ষণিক জনতুষ্টির রাজনীতি: ছাত্ররাজনীতির ময়দানে অনেক সময় জটিল ঐতিহাসিক বাস্তবতার চেয়ে চটুল আবেগ উসকে দিয়ে মাঠ গরম করা সহজ হয়। এই বিতর্কটিকে কেন্দ্র করে ছবি ছেঁড়া এবং পাল্টাপাল্টি স্লোগান তোলা মূলত সেই সস্তা রাজনৈতিক মেরুকরণেরই অংশ।

ইতিহাসের সুবিধাজনক ছাঁটাই (Cherry-picking): জাতীয়তাবাদী আবেগের বশে ইতিহাসের যেসব অধ্যায় অস্বস্তিকর বা বেদনাদায়ক, সেগুলোকে গায়েব করে ফেলার চেষ্টা কোনো পরিণত সমাজের লক্ষণ নয়। ছবি ছিঁড়ে ফেললে ১৯৪৭-এর দেশভাগ যেমন বাতিল হয়ে যায় না, তেমনি জিন্নাহর চাপিয়ে দেওয়া ভাষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের সেই অবিস্মরণীয় দ্রোহের দলিলও মুছে ফেলা যায় না।

৩. বৈশ্বিক সংগ্রহশালার নজির: শত্রু ও মিত্রের সহাবস্থান

বিশ্বের কোনো পরিণত ও গণতান্ত্রিক সমাজেই ইতিহাস জাদুঘর থেকে শত্রু বা খলনায়কদের মুছে ফেলা হয় না। বরং ইতিহাসের গতিপথ বোঝাতে তাদের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা হয়।

(১) ডয়চেস হিস্টোরিশেস মিউজিয়াম (বার্লিন, জার্মানি): জার্মানির আইনে নাৎসিবাদের প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও তাদের জাতীয় ইতিহাস জাদুঘরে এডলফ হিটলার ও জোসেফ গোয়েবলসের ছবি, ভাষণ ও সামরিক দলিল বিস্তারিতভাবে প্রদর্শিত হয়। উদ্দেশ্য হিটলারকে সম্মান জানানো নয়, বরং ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো।
রেফারেন্স: Deutsches Historisches Museum (DHM), German History in Images and Artefacts, Berlin; Neil MacGregor, Germany: Memories of a Nation, Allen Lane.

(২) স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি (ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র): আমেরিকান গৃহযুদ্ধের গ্যালারিতে রাষ্ট্রপতি আব্রাহাম লিংকনের ছবির পাশাপাশি রাষ্ট্রদ্রোহী কনফেডারেট নেতা জেফারসন ডেভিস এবং জেনারেল রবার্ট ই. লির প্রতিকৃতি রাখা আছে। প্রতিটি ছবির পাশে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে তাঁদের দাসপ্রথা সমর্থন ও বিচ্ছিন্নতাবাদের রক্তাক্ত ইতিহাস।
রেফারেন্স: The Civil War in Art and Memory, Kirk Savage, Yale University Press; Smithsonian Institution, National Portrait Gallery Civil War Collection Records.

(৩) ওয়ার মেমোরিয়াল অব কোরিয়া (সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া): কোরীয় যুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতে সিউলের জাতীয় সংগ্রহশালায় মিত্রবাহিনীর প্রধানদের পাশাপাশি তাঁদের চরম শত্রু উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সং এবং মাও সেতুংয়ের ছবি ও যুদ্ধনথি নিরপেক্ষভাবে প্রদর্শন করা হয়।
রেফারেন্স: The War Memorial of Korea: Official Exhibition Guidebook, Seoul; Sheila Miyoshi Jager, Brothers at War: The Unending Conflict in Korea, W. W. Norton & Company.

(৪) ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারি (লন্ডন, যুক্তরাজ্য): ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের সংগ্রহশালায় রাজা প্রথম চার্লসের ছবির পাশাপাশি তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা বিপ্লবী ও সেনাশাসক অলিভার ক্রমওয়েলের ছবি সমমর্যাদায় সংরক্ষিত, যা ব্রিটিশ সাংবিধানিক ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বকে প্রমাণ করে।
রেফারেন্স: National Portrait Gallery: Collection Guide, London; Laura Lunger Knoppers, Constructing Cromwell: Ceremony, Portrait, and Print, Cambridge University Press.

৪. বাস্তবসম্মত ও যৌক্তিক সমাধানের রূপরেখা

ডাকসুর মতো শতবর্ষী ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে এবং অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত বন্ধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য:

● কনটেক্সচুয়াল লেবেলিং (Contextual Labeling) নিশ্চিত করা

বিতর্কিত চরিত্রগুলোর ছবির নিচে স্পষ্ট ও পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক ফুটনোট বা বিবরণী ফলক সংযুক্ত করতে হবে। জিন্নাহর ছবির ক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে লেখা থাকতে পারে:

“১৯৪৮ সালের মার্চে তৎকালীন গভর্নর-জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। কার্জন হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রসমাজ তাৎক্ষণিক ‘No, No’ ধ্বনিতে এই ঘোষণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়, যা ছিল বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রথম বুদ্ধিবৃত্তিক মাইলফলক।”

● স্মারক বনাম নথির সীমারেখা রক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রনেতৃত্বকে বুঝতে হবে—ডাকসুর সভাকক্ষ বা মূল মিলনায়তনে কাদের ছবি ঝুলবে, তা সম্মান ও শ্রদ্ধার বিষয়; কিন্তু ডাকসুর ‘সংগ্রহশালা বা আর্কাইভে’ কী সংরক্ষিত থাকবে, তা সম্পূর্ণ অ্যাকাডেমিক ও ঐতিহাসিক প্রমাণের বিষয়।

● সংগ্রহশালার অ্যাকাডেমিক স্বায়ত্তশাসন

কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক মবের দাবির মুখে আর্কাইভাল নথির প্রদর্শন বন্ধ করা যাবে না। ইতিহাসবিদ, জাদুঘর বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ প্যানেল গঠন করে সামগ্রিক সংগ্রহশালার প্রদর্শনী কাঠামো পর্যালোচনা ও চূড়ান্ত করা যেতে পারে।

ইতিহাস কোনো রূপকথার গল্প নয়, যেখানে কেবল নায়কেরাই বাস করবে। ইতিহাস হলো আলো ও অন্ধকারের এক যৌথ আলেখ্য। যে জাতি তার অতীত ভুলের ইতিহাস বা শত্রুর রূপরেখা সংরক্ষণ করতে ভয় পায়, তারা নিজের অর্জনের গভীরতাও পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না। ডাকসুর সংগ্রহশালায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি থাকা মানে তাঁর প্রতি নতিস্বীকার নয়; বরং সেই আগ্রাসনের ছবি সংরক্ষণ করা—যার বুকে পা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ একসময় বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল।

মো. সাদ্দাম হোসাইন
জনসংযোগ কর্মকর্তা, আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স
এমএ (ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়




Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: