প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বাংলাদেশের সক্রিয় উদ্যোগ

মুহাম্মদ তানভীর

মতামত

পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত মালদ্বীপ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি- মার্কিন ডলারের

2026-09-11T20:53:48+00:00
2026-09-11T21:18:10+00:00
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
মালদ্বীপের ডলার সংকট
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বাংলাদেশের সক্রিয় উদ্যোগ
মুহাম্মদ তানভীর
শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৫৩ পিএম  আপডেট: ১১.০৯.২০২৬ ৯:১৮ পিএম
লেখক: মুহাম্মদ তানভীর। গবেষণা সহকারী, ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়
পর্যটননির্ভর অর্থনীতি, বিলাসবহুল রিসোর্ট এবং বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটকের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত মালদ্বীপ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি- মার্কিন ডলারের সংকট। পর্যটন খাত সচল থাকলেও বৈদেশিক মুদ্রার সীমিত প্রাপ্যতা দেশটির ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, আমদানিকারক ও প্রবাসী কর্মীদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি করছে।

এই সংকটের প্রভাব পড়ছে প্রবাসী কর্মীদের অর্থ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও। বিশেষ করে মালদ্বীপে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক মালদ্বীপিয়ান রুফিয়ায় (MVR) বেতন পেলেও দেশে অর্থ পাঠানোর সময় মার্কিন ডলারের সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মালদ্বীপ থেকে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের সবচেয়ে বড় গন্তব্য বাংলাদেশ। মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির (MMA) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মালদ্বীপ থেকে বহির্মুখী মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৭২ শতাংশ বাংলাদেশে গেছে।

ফলে মালদ্বীপের বর্তমান ডলার সংকটকে শুধু একটি মুদ্রাবাজারের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মী, তাদের আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও সরাসরি যুক্ত।

ডলার সংকটের বাস্তবতা

মালদ্বীপের ডলার সংকট শুধু বাংলাদেশিদের জন্য প্রাসঙ্গিক কোনো বিষয় নয়; এটি দেশটির সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও অর্থনীতির একটি বৃহত্তর সমস্যা।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বিভিন্ন সময়ে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বহিঃখাতের ঝুঁকিকে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও IMF মালদ্বীপের অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার পাশাপাশি বহিঃখাতের চাপ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

সমস্যাটি সরকারি ও সমান্তরাল বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বিনিময় হারের ব্যবধানেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারি বিনিময় হার প্রতি মার্কিন ডলারে প্রায় ১৫–১৬ মালদ্বীপিয়ান রুফিয়া হলেও বিভিন্ন সময়ে সমান্তরাল বাজারে প্রতি ডলারের দাম ২২–২৩ রুফিয়া বা তারও বেশি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

একজন প্রবাসী শ্রমিকের জন্য এই ব্যবধান নিছক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি সরাসরি তার উপার্জনের প্রকৃত মূল্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, একজন শ্রমিক ১৫ হাজার রুফিয়া দেশে পাঠাতে চান। সরকারি হারে এর মূল্য প্রায় ৯৬৮ ডলার। অন্যদিকে, প্রতি ডলারে ২২ রুফিয়া হারে হিসাব করলে একই অর্থের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬৮২ ডলার। অর্থাৎ বিনিময় হারের বড় ব্যবধান থাকলে একজন শ্রমিককে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: অনানুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স

ডলারের ঘাটতি আরেকটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে—অনানুষ্ঠানিক বা হুন্ডি চ্যানেলের বিস্তার।

বৈধ ব্যবস্থায় ডলার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে এবং সরকারি ও সমান্তরাল বাজারের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকলে প্রবাসী কর্মীদের অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়তে পারে।

এটি উভয় দেশের জন্যই ক্ষতিকর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ফলে বৈধ ও হিসাবভুক্ত রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অন্যদিকে, মালদ্বীপের জন্য অনানুষ্ঠানিক বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আর্থিক স্বচ্ছতা ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

তাই সমাধানের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো সহজ, নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হয়।

বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ

মালদ্বীপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে। নির্মাণ, পর্যটন, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, সেবা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য খাতে বাংলাদেশি কর্মীরা অবদান রাখছেন।

অন্যদিকে, মালদ্বীপ থেকে বহির্মুখী রেমিট্যান্সের প্রধান গন্তব্য বাংলাদেশ। MMA-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট বহির্মুখী রেমিট্যান্সের প্রায় ৭২ শতাংশ বাংলাদেশে গেছে। এই পরিসংখ্যানই দুই দেশের মধ্যে রেমিট্যান্সকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগ হিসেবে তুলে ধরে।

এ কারণে মালদ্বীপের ডলার সংকটকে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে শুধু একটি ব্যাংকিং সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ, শ্রম কূটনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

হাইকমিশনের সক্রিয় ও বহুমুখী উদ্যোগ

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন, মালে একটি সক্রিয় ও বহুমুখী ভূমিকা গ্রহণ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়।

প্রচলিত কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি হাইকমিশন মালদ্বীপের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছে। হাইকমিশনার ড. মো. নাজমুল ইসলাম ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহী ও ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আলোচনা করে ডলার সংকটের প্রকৃতি, ব্যাংকিং খাতে এর প্রভাব এবং বাংলাদেশি কর্মীদের রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেছেন।

একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটি এবং দেশটির সরকারের সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—ডলার সংকটটি বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা কোনো সমস্যা নয়; এটি মালদ্বীপের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের বৃহত্তর সংকটের অংশ। মালদ্বীপের নাগরিক ও ব্যবসায়ীরাও বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে

বাংলাদেশকে নতুন করে রেমিট্যান্স অবকাঠামো গড়ে শূন্য থেকে শুরু করতে হচ্ছে না। মালদ্বীপে ইতোমধ্যে NBL Money Transfer (Maldives) Pvt. Ltd. কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি National Bank Limited-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান এবং ২০১১ সাল থেকে মালদ্বীপে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বৈধ রেমিট্যান্সের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই রয়েছে। তাই শুধু নতুন কোনো মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক চালু করলেই বর্তমান সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হবে—এমনটা মনে করার কারণ নেই।

মূল সমস্যা হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য বা foreign-exchange liquidity।

সহজভাবে বললে, নতুন ব্যাংক বা নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান একটি ভালো রেমিট্যান্স চ্যানেল তৈরি করতে পারে; কিন্তু বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকা ডলার তৈরি করতে পারে না।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সমস্যাটির কাঠামোগত সমাধানের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

প্রবাসী কর্মীদের জন্য বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ

হাইকমিশনের উদ্যোগ শুধু ব্যাংক ও সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়; বাংলাদেশি কর্মী ও তাদের নিয়োগকর্তাদেরও এই প্রক্রিয়ার অংশ করা প্রয়োজন।

যেখানে আইনগত ও বাস্তবসম্মতভাবে সম্ভব, সেখানে নিয়োগকর্তাদের ডলার-সংযুক্ত বেতনব্যবস্থা কিংবা কর্মীদের বৈধ চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহে সহযোগিতা করার বিষয়ে উৎসাহিত করা যেতে পারে।

এটি শ্রম কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আধুনিক শ্রম কূটনীতি এখন শুধু পাসপোর্ট, শ্রমবিরোধ, আটক বা প্রত্যাবাসনের মতো বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়; একজন প্রবাসী শ্রমিকের উপার্জনের প্রকৃত মূল্য রক্ষা করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগ সেই বিস্তৃত শ্রম কূটনীতিরই প্রতিফলন হতে পারে।

সম্ভাব্য সমাধানের পথ

বর্তমান সংকটের কোনো একক সমাধান নেই। তবে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ যৌথভাবে কয়েকটি বাস্তবসম্মত উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে।

প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংক– MMA কারিগরি সংলাপ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির মধ্যে একটি কারিগরি সংলাপ শুরু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের রেমিট্যান্সের জন্য আরও পূর্বানুমানযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যবস্থা তৈরি করা যায় কি না, তা পরীক্ষা করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে MVR-to-BDT বা স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক settlement mechanism- এর সম্ভাবনাও কারিগরি পর্যায়ে পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বৈধ রেমিট্যান্সের জন্য বৈদেশিক মুদ্রার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা। মালদ্বীপের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা অক্ষুণ্ন রেখেই বৈধ প্রবাসী রেমিট্যান্সের জন্য একটি পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, নিয়োগকর্তাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো। আইন ও নীতিমালা অনুমোদন করলে নিয়োগকর্তাদের মাধ্যমে ডলার-সংযুক্ত বেতন বা বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কর্মীদের সমান্তরাল বাজারের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে।

চতুর্থত, বাংলাদেশের ব্যাংকিং উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করা। মালদ্বীপে বাংলাদেশের ব্যাংকিং উপস্থিতি বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে রেমিট্যান্স, বাণিজ্য অর্থায়ন এবং বিনিয়োগে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বর্তমান সংকট একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে—ব্যাংকিং উপস্থিতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য পরস্পর সম্পর্কিত হলেও একেবারে একই সমস্যা নয়।

পঞ্চমত, বৃহত্তর আর্থিক সহযোগিতা। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ ভবিষ্যতে বাণিজ্য নিষ্পত্তি, বিনিয়োগ, আর্থিক প্রযুক্তি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে বৃহত্তর আর্থিক সহযোগিতার সুযোগ খুঁজে দেখতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যথাযথ মূল্যায়নের ভিত্তিতে প্রয়োজন ও সম্ভাবনা থাকলে কাঠামোবদ্ধ অর্থায়ন বা সম্ভাব্য Line of Credit নিয়েও আলোচনা করা যেতে পারে।

শ্রম কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক

ডলার সংকটের পাশাপাশি মালদ্বীপে বিদেশি কর্মীদের অবস্থান ও বৈধতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে।

বাংলাদেশ হাইকমিশন এসব বিষয়েও মালদ্বীপ সরকারের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বলে জানা যায়।

উচ্চপর্যায়ের গোপনীয় আলোচনায় হাইকমিশনকে এমন একটি সম্ভাব্য নীতিগত পদক্ষেপ সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল, যার ফলে তৎকালীন নীতিগত বিবেচনার অধীনে প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর প্রত্যাবাসন বা বহিষ্কারের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারত বলে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা হয়েছিল।

বিষয়টি যেহেতু গোপনীয় পর্যায়ের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এটিকে প্রকাশ্য বা নিশ্চিত সরকারি সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি মালদ্বীপে বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় ধারাবাহিক ও সক্রিয় কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার গুরুত্ব স্পষ্ট করে।

এ ক্ষেত্রে হাইকমিশনের নীতি হওয়া উচিত সংঘাত নয়; বরং সংলাপ, সমঝোতা এবং নীরব কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা করা।

সংকট থেকে নতুন সুযোগ

মালদ্বীপের বর্তমান ডলার সংকট নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। তবে একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশি কর্মীরা মালদ্বীপের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অন্যদিকে, মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য রেমিট্যান্স প্রবাহিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য খাতেও বাংলাদেশ দক্ষ জনবল সরবরাহের মাধ্যমে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখতে পারে।

তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ–মালদ্বীপ সম্পর্ক শুধু শ্রমবাজার বা প্রচলিত কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আর্থিক সংযোগ, ব্যাংকিং, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং দক্ষ জনশক্তি সহযোগিতার একটি বিস্তৃত কাঠামোতে রূপ দেওয়া যেতে পারে।

সক্রিয় কূটনীতির একটি উদাহরণ

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—মালদ্বীপের সংকটকে শুধু বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ সুবিধা আদায়ের বিষয় হিসেবে না দেখে দেশটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বৈধ আয় ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।

এটি আধুনিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে, যেখানে প্রবাসী কল্যাণ, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জাতীয় স্বার্থ একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকার এবং মালে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার সমন্বয়ে এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান।

তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হওয়া উচিত—বাংলাদেশি কর্মীরা যেন তাঁদের বৈধ উপার্জন নিরাপদে, স্বচ্ছভাবে এবং অযৌক্তিক বিনিময়-ক্ষতি ছাড়াই দেশে পাঠাতে পারেন।

দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হতে পারে—বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও স্থিতিস্থাপক আর্থিক করিডর গড়ে তোলা।

মালদ্বীপের ডলার সংকট হয়তো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু বাংলাদেশের সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ এই সংকটকে একই সঙ্গে একটি সম্ভাবনায় রূপ দিতে পারে—প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষা, বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং বাংলাদেশ–মালদ্বীপের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করার সম্ভাবনা।

লেখক: মুহাম্মদ তানভীর
গবেষণা সহকারী, ইবনে খালদুন বিশ্ববিদ্যালয়



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: