সকাল আটটায় ইশকুল। তার আগে ঘুম থেকে ওঠা, তৈরি হওয়া, নাশতা খাওয়া- সবকিছুর জন্য সময় খুব কম। ইশকুলে গিয়ে ক্লাস। তারপর ক্লাস টেস্ট, মান্থলি টেস্ট, সারপ্রাইজ টেস্ট, মিডটার্ম, অ্যাসাইনমেন্ট। ইশকুল ছুটির পর কোচিং। বাড়ি ফিরে আবার পরদিনের পড়া তৈরি। কোনো দিন কোনো পরীক্ষা থাকলে রাত আরও একটু বাড়ে। বই-খাতা গুছিয়ে বিছানায় যেতে যেতে রাত গভীর হয়। অভিভাবকের উৎকণ্ঠা বাড়ে। অথচ পরদিন আবার সেই সকাল আটটায় ইশকুল।
এই শিশুর সারাদিনে যা হারিয়ে যাচ্ছে তা হলো- সময়। ঘুমের সময়, খাওয়ার সময়, খেলাধুলার সময়, পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময়, এমনকি কোনো কাজ না করে শুধু শিশুর মতো থাকার সময়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি ভুল সম্ভবত এখানেই: আমরা শিশুর শেখার সময়কে যত বাড়াতে চাইছি, ততই ভুলে যাচ্ছি যে শিশু শুধু পড়াশোনা করে শেখে না। সে খেলে, ঘুমায়, কথা বলে, কৌতূহলী হয়, গল্প করে, দৌড়ায়, বিরক্ত হয়, বিশ্রাম নেয়- এসবের মধ্য দিয়েও তার মস্তিষ্ক ও ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়।
প্রাথমিক বয়সের শিশুর জন্য ঘুম কোনো বিলাসিতা নয়। ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর নিয়মিতভাবে প্রতিদিন ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমের সুপারিশ করেছে আমেরিকান Academy of Sleep Medicine; American Academy of Pediatrics-ও এই সুপারিশ সমর্থন করেছে। পর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে শেখা, মনোযোগ ও আচরণের সম্পর্ক আছে।
তাহলে আমাদের শহুরে শিক্ষাব্যবস্থায় যে শিশুকে সকাল আটটার ইশকুল ধরতে ভোরে উঠতে হয়, রাতে দীর্ঘ সময় পড়তে হয় এবং দিনের বাকি সময়ও কোচিং বা অতিরিক্ত পড়াশোনায় চলে যায়, তার ঘুমের সময় কোথায়?
সমস্যা শুধু ঘুমের নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশু ও কিশোরদের প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০ মিনিট মাঝারি থেকে জোরালো মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ড করা উচিত। এই কর্মকাণ্ডের মধ্যে খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ, বিনোদন, শরীরচর্চা- সবই পড়ে। এর সঙ্গে শিশুর দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুর প্রতিদিনের সময়সূচি এমন হওয়া উচিত নয়, যেখানে স্কুল, homework, assignment, test preparation এবং coaching মিলে তার পুরো দিন দখল করে নেয়। খেলার সময় শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়, শিশুর সুস্থ বিকাশের অংশ।
খাবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। রাতে দেরি করে ঘুমানো, সকালে তাড়াহুড়ো করে ওঠা এবং আটটার ইশকুল ধরার চাপে অনেক শিশুর নাশতা খাওয়া বাদ পড়ে যায়- এমন অভিযোগ অভিভাবকদের কাছ থেকে প্রায়ই শোনা যায়। বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের মধ্যে নাশতা বাদ দেওয়ার জাতীয় হার নিয়ে নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক তথ্য নেই। এ বিষয়েও আমাদের জরিপ হওয়া দরকার।
শিশু সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কী শিখল- শুধু সেই হিসাব না করে তাকে কীভাবে শিখতে দেওয়া হলো, সেটাও দেখা উচিত। আর এখানে আসে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি। পরীক্ষার দরকার আছে। শিক্ষককে জানতে হবে একজন শিশু কী শিখেছে, কোথায় পিছিয়ে আছে, কোথায় তাকে সহায়তা দিতে হবে। কিন্তু মূল্যায়ন আর পরীক্ষার সংখ্যা এক ব্যাপার নয়। প্রতিদিন শেখার সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনমতো feedback এক ধরনের মূল্যায়ন, বারবার পরীক্ষা নিয়ে শিশুকে প্রস্তুতির চাপে রাখা আরেক ধরনের বিষয়। অতিরিক্ত পরীক্ষা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের ওপর চাপ বাড়াতে পারে এবং শেখার আনন্দ কমিয়ে দিতে পারে। খুব ঘন ঘন পরীক্ষা anxiety, অনুপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাস কমার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
প্রথম প্রয়োজন ইশকুলভিত্তিক শিশুবান্ধব workload policy। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণির জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ কত homework, কত assignment, কতটি formal test নেওয়া যাবে- এ বিষয়ে ন্যূনতম জাতীয় নির্দেশনা থাকা দরকার। একই সঙ্গে একই দিনে একাধিক বিষয়ের পরীক্ষা বা বড় assignment দেওয়ার প্রবণতা বন্ধে ইশকুলগুলোর নিজস্ব academic calendar সমন্বয় করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, homework-এর উদ্দেশ্য পরিষ্কার করতে হবে। শিশুকে রাত জাগিয়ে খাতা ভরানো homework নয়। শ্রেণিকক্ষে শেখানো বিষয় অনুশীলন, পড়ার অভ্যাস তৈরি, কৌতূহল জাগানো- এসবই homework-এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। শিশু যদি homework শেষ করতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা সময় নেয়, তাহলে দেখা উচিত শিশুর জন্য কাজের পরিমাণ ও উপযোগিতা ঠিক আছে কিনা।
তৃতীয়ত, coaching-এর ওপরও নীতিগত আলোচনা দরকার। ইশকুলে যে শিক্ষা যথেষ্ট নয়, সেই ঘাটতি পূরণের জন্য শিশুকে প্রতিদিন ইশকুলের পর আরেকটি ইশকুলে পাঠানো হলে মূল শিক্ষাব্যবস্থার দায় কোথায়? কোচিং নিষিদ্ধ করার সহজ স্লোগান দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং ইশকুলের শিক্ষাদান এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে প্রাথমিক বয়সে coaching না করেও শিশু স্বাভাবিকভাবে শিখতে পারে।
চতুর্থত, ইশকুলের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিশুর ঘুম, সকালের খাবার এবং যাতায়াতের সময়কে বিবেচনায় নিতে হবে। সকাল আটটার ইশকুল হয়তো ঠিক আছে, যদি সেই সময়ের কারণে শিশু নিয়মিত ঘুমের ঘাটতিতে না পড়ে বা তার নাশতা খাওয়া বাদ না যায়। এমন হলে ইশকুলের সময়সূচিকে শিশুর প্রয়োজনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।
সবচেয়ে কঠিন পরিবর্তন দরকার অভিভাবকদের মনে। ‘আমার সন্তান প্রতিদিন কত ঘণ্টা পড়ে’- এই প্রশ্নের সঙ্গে আরও যে প্রশ্ন যোগ করতে হবে তা হলো- সে কত ঘণ্টা ঘুমায়, কতক্ষণ খেলে, কখন খায়, পরিবারের সঙ্গে কতক্ষণ কথা বলে?
শিশুকে অবশ্যই পড়তে দিতে হবে, তবে পড়ার সঙ্গে তাকে বাঁচতে দিতে হবে। তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে হবে, কিন্তু পরীক্ষার ভয়ে বড় করা যাবে না। তাকে homework দিতে হবে, কিন্তু homework-এর জন্য তার ঘুম কেড়ে নেওয়া যাবে না। তাকে ইশকুলে পাঠাতে হবে, কিন্তু ইশকুলের বাইরে তার পৃথিবীটাকেও অক্ষত রাখতে হবে।
আমরা যদি শিশুর সবগুলো অবসরকে পড়ার সময় বানিয়ে ফেলি, তাহলে হয়তো তার খাতায় অনেক উত্তর থাকবে। কিন্তু তার শৈশবে কতটা জীবন থাকবে- সেই প্রশ্নটিই থেকে যাবে!