অপ্রতিমের পর আর কতজন শিশুর জন্য প্রতীক্ষা!

ভোরের ডাক ডেস্ক

মতামত

শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ১৩ বছরের অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। কুমিল্লার

2026-09-19T19:51:39+00:00
2026-09-19T20:15:33+00:00
  রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
 
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
অপ্রতিমের পর আর কতজন শিশুর জন্য প্রতীক্ষা!
দীপু মাহমুদ
ভোরের ডাক ডেস্ক
শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:৫১ পিএম  আপডেট: ১৯.০৯.২০২৬ ৮:১৫ পিএম
সংগৃহীত ছবি
শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ১৩ বছরের অপ্রতিম মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বের হয়েছিল। কুমিল্লার কোটবাড়ির পরিচিত এলাকা। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিমের জন্য এটি ছিল নিছক একটি বিকেল। কিন্তু সেই বিকেল আর তার জীবনে ফিরে আসেনি। সন্ধ্যার পরও সে বাড়ি না ফেরায় পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি করে, স্বজনেরা খোঁজ শুরু করেন। পুলিশও তার সর্বশেষ অবস্থান ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছিল। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের কাছের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় অপ্রতিমের মরদেহ। পুলিশ জানিয়েছে, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, সেটি এখন তদন্তের বিষয়।

অপ্রতিমের পরিবারের জন্য এটা সন্তানের মৃত্যু। আমাদের জন্য এটা তার চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন- বাংলাদেশে শিশু কতটা নিরাপদ?

প্রশ্নটি আবেগ থেকে আসছে না। সংখ্যাগুলোই প্রশ্নটি সামনে আনছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের যাচাই করা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে; ২ হাজার ৩৮ জন তখনো নিখোঁজ। ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের নিখোঁজের সংখ্যা ১৫ হাজার ২৪৩। পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, নিখোঁজের এসব ঘটনায় নানা কারণ আছে- পারিবারিক কলহ, পড়াশোনার চাপ, অভিমান, বন্ধু বা সহপাঠীদের প্রভাব, স্বাধীনভাবে থাকার আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি। অনলাইন জিডি চালুর কারণেও নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির সংখ্যা বেড়েছে।

এই ব্যাখ্যাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘নিখোঁজ’ মানেই অপহরণ বা হত্যার শিকার- এমন সরল সমীকরণ করা ঠিক নয়। অধিকাংশ শিশুকে উদ্ধারও করা হয়েছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ শিশু এখনো নিখোঁজ-এই সংখ্যাকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি পরিবার, অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তা।

শিশুর নিরাপত্তার আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় সহিংসতার পরিসংখ্যানে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতায় অন্তত ১৯৫ শিশু নিহত হয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণে ৭৬ জনের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে, ৬১ জনের বয়স ছয় বছর বা তার কম এবং ৪৯ জনের বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে। একই সময়ে ধর্ষণের পর ২১ জন শিশু নিহত হয়েছে এবং ১৭ শিশু আত্মহত্যা করেছে। এই হিসাব গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও সংগঠনটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি।

অর্থাৎ শিশুর ঝুঁকি শুধু রাস্তার অন্ধকারে নয়; ঝুঁকি বাড়ির ভেতরেও থাকতে পারে, পরিচিত মানুষের কাছেও থাকতে পারে, পারিবারিক সম্পর্কের ভেতরেও থাকতে পারে, আবার শিশুর নিজের মানসিক সংকটের সঙ্গেও যুক্ত হতে পারে। শিশু সুরক্ষার প্রশ্ন তাই কোনো একক অপরাধের প্রশ্ন নয়। এটা একটি সমন্বিত সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের প্রশ্ন।

অপ্রতিমের ঘটনা এই জায়গাটিতেই আমাদের থামিয়ে দেয়। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যে আতঙ্কের মধ্য দিয়ে যায়, সেটা আমরা সাধারণত বুঝতে পারি যখন এমন কোনো ঘটনা সংবাদে আসে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কাছে প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে আতঙ্কের মাত্রা একই হওয়া উচিত। শিশু ধনী পরিবারের হোক কিংবা দরিদ্র পরিবারের, শহরের হোক কিংবা গ্রামের, পরিচিত এলাকায় নিখোঁজ হোক কিংবা দূরের কোনো স্থানে- নিখোঁজ হওয়ার প্রথম মুহূর্ত থেকেই তাকে উদ্ধারের কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এখানে পুলিশের কাজ শুধু জিডি গ্রহণে শেষ হতে পারে না। শিশুর সর্বশেষ অবস্থান, মোবাইল ফোনের তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, সম্ভাব্য চলাচলের পথ, গণপরিবহন, বন্ধুবান্ধব ও যোগাযোগের তথ্য দ্রুত সমন্বয় করে অনুসন্ধানে নামতে হবে। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা যে কত মূল্যবান, সেটা তদন্তব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

বাংলাদেশে প্রযুক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান, সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ কিংবা ডিজিটাল যোগাযোগের সূত্র তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি তখনই কার্যকর, যখন তথ্য দ্রুত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হয়। নিখোঁজ শিশুর ক্ষেত্রে এই সমন্বয়কে নিয়মিত প্রটোকলে পরিণত করা প্রয়োজন।

আরেকটি জায়গায় বড় পরিবর্তন দরকার- নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধারের পরও রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয় না। সে কোথায় ছিল, কেন গিয়েছিল, তার সঙ্গে কী ঘটেছে, সে কোনো অপরাধ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে কিনা- এসবও অনুসন্ধানের অংশ হওয়া উচিত। ফিরে আসা শিশুকে শুধু পরিবারের কাছে হস্তান্তর করলেই সুরক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং পুনরায় ঝুঁকিতে না পড়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

শিশুহত্যার ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োজন দ্রুত ও পেশাদার তদন্ত। অপ্রতিমের মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা করার আগে তদন্ত ও ময়নাতদন্তের ফলের জন্য অপেক্ষা করা জরুরি। কিন্তু তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা পুলিশ জানিয়েছে- তাই ঘটনাটির প্রতিটি সূত্র যথাযথভাবে পরীক্ষা করা এবং দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরের ব্যবস্থা দিয়ে শুরু করলে চলবে না। কোথায় শিশুরা একা হয়ে পড়ে, কোন রাস্তা বা এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ, কোথায় পর্যাপ্ত আলো নেই, কোথায় নজরদারি নেই, কোথায় শিশুদের যাতায়াত বেশি অথচ নিরাপত্তাব্যবস্থা কম- স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিতভাবে এসব ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করতে হবে। স্কুল, স্থানীয় সরকার, পুলিশ ও কমিউনিটিকে সেই কাজে যুক্ত করা যেতে পারে।

পরিবারের দায়িত্বও কম নয়। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে যাচ্ছে- এসব জানার পাশাপাশি শিশুর সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা দরকার, যাতে সে বিপদে পড়লে ভয় না পেয়ে বাবা-মা বা অন্য বিশ্বস্ত বড়দের জানাতে পারে। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ যেমন সমাধান নয়, তেমনি শিশুর স্বাধীন চলাচলকে সম্পূর্ণ নজরদারির বাইরে রাখাও নিরাপদ নয়। প্রয়োজন বিশ্বাস, যোগাযোগ এবং বয়স উপযোগী নিরাপত্তাবোধ।

স্কুলগুলোরও শিশু সুরক্ষার নিজস্ব ব্যবস্থা থাকা দরকার। কোনো শিক্ষার্থী হঠাৎ ভীত হয়ে পড়ছে, আচরণ বদলে যাচ্ছে, নিয়মিত অনুপস্থিত থাকছে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে কিংবা অস্বাভাবিক চাপের মধ্যে আছে- এসবকে শুধু ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষকরা শিশুর জীবনে এমন একজন প্রাপ্তবয়স্ক হতে পারেন, যার কাছে সে বিপদের কথা বলতে সাহস পায়।

সবচেয়ে বড় কথা, শিশুকে আমাদের করুণা নয়, নিরাপত্তা দিতে হবে। তাকে ‘জাতির ভবিষ্যৎ’ বলে মঞ্চে তুলে প্রশংসা করার চেয়ে আজকের বাংলাদেশে তার বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। যে শিশু আজ স্কুলে যায়, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলে, মাঠে খেলে, রাস্তায় হাঁটে-তার জীবন আজই মূল্যবান।

অপ্রতিমের মা-বাবা হয়তো এখন বারবার সেই শুক্রবার বিকেলের কথাই ভাবছেন। কোন মুহূর্তে কী ঘটেছিল, কোথায় গেলে ছেলেকে পাওয়া যেত, আরও আগে কী করা যেত- এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর হয়তো তাদের শোক কমাবে না। কিন্তু তদন্তের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ বিচার শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়; ভবিষ্যতে একই বিপদে পড়তে পারে এমন অসংখ্য শিশুর নিরাপত্তার জন্যও জরুরি।

একজন শিশুর নিখোঁজ হওয়া যেন আরেক নিখোঁজ শিশুর অপেক্ষা তৈরি না করে। একজন শিশুর মৃত্যু যেন কেবল কয়েক দিনের সংবাদ হয়ে না থাকে। অপ্রতিমের ঘটনা থেকে আমাদের যে শিক্ষা নেওয়ার, সেটা খুব সরল- শিশু নিখোঁজ হলে দ্রুত রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া, অনুসন্ধানে প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ, শিশুবান্ধব পুলিশি ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় মনোসামাজিক সহায়তা এবং অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত- এসবকে আর বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না।

যেকোনো দেশের নিরাপত্তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা তার সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ- সেটা দিয়ে করা যায়।

বাংলাদেশে সেই পরীক্ষায় শিশুদের জন্য আমাদের আরও অনেক কাজ বাকি।

অপ্রতিমের মৃত্যুর তদন্ত শেষ হোক সত্য উদ্‌ঘাটনের মধ্য দিয়ে। আর তার পরের কাজ হোক আরও বড়-যাতে কোনো মা-বাবাকে বিকেলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া সন্তানের জন্য রাতভর প্রতীক্ষা করতে না হয়।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: