বাংলাদেশ শিশু একাডেমির মহাপরিচালকের পদ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল ২০২৪ সালের আগস্টে, তার সমাধান আজও সংস্কৃতি ও শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বকে স্থায়ী ও স্বাভাবিক কাঠামোয় ফিরিয়ে আনতে পারেনি। সরকার বদলের পর ১৩ আগস্ট ২০২৪ মহাপরিচালক আনজীর লিটন পদত্যাগ করেন। এরপর অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালানোর ব্যবস্থা করা হয়। ২১ আগস্ট অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ভূঞাকে এবং ২৯ আগস্ট সেই আদেশ বাতিল করে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব তানিয়া খানকে মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখনই বোঝা যাচ্ছিল, শিশু একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের প্রশ্নটি নিছক একটি পদ পূরণের বিষয় নয়, এর সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কাজের ধারাবাহিকতা সরাসরি যুক্ত।
শিশু একাডেমির সেই অভিজ্ঞতার পর এখন একই প্রশ্ন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরে উঠছে। ২১ সেপ্টেম্বর কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের এক বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়েছে। নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহা. হারুন-অর-রশীদকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে একাডেমির দৈনন্দিন কার্যক্রম, প্রয়োজনীয় আর্থিক ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক কাজ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান চলছে, কিন্তু আপাতত নিয়মিত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে নয়।
একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এমন অস্থায়ী ব্যবস্থা কিছুদিনের জন্য প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন অস্থায়ী ব্যবস্থা ক্রমেই স্বাভাবিক ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে ওঠে। শিল্পকলা একাডেমির সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিষয়টি বিশেষভাবে লক্ষ্য করার মতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট লিয়াকত আলী লাকী পদত্যাগ করার পর ৯ সেপ্টেম্বর নাট্যনির্দেশক ও গবেষক সৈয়দ জামিল আহমেদকে দুই বছরের জন্য মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ মোহাম্মদ ওয়ারেছ হোসেনকে ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে ১৪ সেপ্টেম্বর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবুল ফয়েজকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। প্রায় এক সপ্তাহ পর ২১ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব নেন রেজাউদ্দিন স্টালিন। এবার তার এক বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আবারও অতিরিক্ত দায়িত্ব।
অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময়ে শিল্পকলা একাডেমির শীর্ষ নেতৃত্বে একাধিক পরিবর্তন হয়েছে। এটা শুধু ব্যক্তিবদলের হিসাব নয়। প্রত্যেক নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে আসে নতুন পরিকল্পনা, নতুন অগ্রাধিকার এবং নতুনভাবে কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া। আবার নেতৃত্বের পরিবর্তন হলে চলমান পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কাজ তো কেবল আজকের অনুষ্ঠান আয়োজন কিংবা প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তি নয়। শিল্পী তৈরি, সাংস্কৃতিক সংগঠনকে সহায়তা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিল্পচর্চাকে এগিয়ে নেওয়া, প্রশিক্ষণ, নাটক-সংগীত-নৃত্য-চারুকলার চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক তৈরি- এসবের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
শিশু একাডেমির অভিজ্ঞতাও এ ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক করার মতো। শিশু একাডেমির কার্যক্রমের ব্যাপ্তি অনেক- শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ, প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা, পাঠাভ্যাস ও গ্রন্থাগার কার্যক্রম, শিশুতোষ বই প্রকাশ, জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা, শিশু অধিকার এবং দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় শিশুদের সৃজনশীল বিকাশের কাজ। কিন্তু সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাজের ব্যাপ্তির তুলনায় বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো সীমিত, জনবল ও বাজেটও প্রয়োজনের তুলনায় কম। একাডেমিকে অধিদপ্তরে উন্নীত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন হলো, এত বড় দায়িত্বের প্রতিষ্ঠানগুলো কি অস্থায়ী নেতৃত্ব ও সীমিত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দীর্ঘদিন চলতে পারে?
শিশু একাডেমির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। যে প্রতিষ্ঠান শিশুদের সৃজনশীলতা, কল্পনাশক্তি ও সাংস্কৃতিক বিকাশ নিয়ে কাজ করে, তার নিজেরই যদি সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল থাকে, জনবল সংকট থাকে, বাজেটের সীমাবদ্ধতা থাকে এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে শিশুদের জন্য রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার গুরুত্ব নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। শিশুদের জন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে কেবল অনুষ্ঠান আয়োজনের দপ্তর হিসেবে দেখলে তার মূল উদ্দেশ্যটাই ছোট হয়ে যায়।
শিল্পকলা একাডেমির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি এটা। দেশের শিল্পী, নাট্যকর্মী, সংগীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, চারুশিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। ফলে এর নেতৃত্বে অনিশ্চয়তা শুধু একাডেমির প্রশাসনিক বিষয় হয়ে থাকে না, এর প্রভাব দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও পড়ে।
এখানে আরও একটি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। মহাপরিচালক পদে কাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেটা সরকারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু এমন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে শুধু প্রশাসনিক যোগ্যতা যথেষ্ট কিনা, তাও ভেবে দেখা দরকার। শিল্পকলা একাডেমির কাজের ধরন বোঝেন, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পারেন- এমন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজন। শিশু একাডেমির ক্ষেত্রেও একইভাবে শিশুসাহিত্য, শিল্প-সংস্কৃতি ও শিশুর বিকাশের জগত সম্পর্কে বাস্তব ধারণা থাকা নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ।
অস্থায়ী দায়িত্ব পালনকারী একজন সরকারি কর্মকর্তা অবশ্যই প্রশাসনিক কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার দায় চাপানো এবং একই সঙ্গে নিয়মিত মহাপরিচালকের অনুপস্থিতিকে স্বাভাবিক করে ফেলা দুটো ভিন্ন বিষয়। একটি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন প্রশাসন সচল রাখা আর প্রতিষ্ঠানটির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা এক কথা নয়।
তাই শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান পরিস্থিতিকে শুধু ‘নতুন মহাপরিচালক কে হচ্ছেন’- এই কৌতূহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। গত দুই বছরে নেতৃত্বের যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান দরকার। একই সঙ্গে শিশু একাডেমির সাংগঠনিক দুর্বলতাগুলোও দূর করা প্রয়োজন। শুধু পদে মানুষ বসানো নয়, প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করার মতো জনবল, বাজেট, সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনাও নিশ্চিত করতে হবে।
সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে গেলে তার ক্ষতি সব সময় সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে না। কোনো সেতু ভেঙে পড়ার মতো তার দৃশ্যমান ধ্বংস নেই, কোনো কারখানা বন্ধ হওয়ার মতো সরাসরি অর্থনৈতিক হিসাবও নেই। কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশিক্ষণ কমে, নতুন শিল্পী তৈরির সুযোগ সংকুচিত হয়, সাংস্কৃতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, প্রতিষ্ঠান মানুষের আস্থা হারায়। সবচেয়ে বড় কথা, রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক দায়িত্বটি তখন প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শিশু একাডেমির দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ও কাঠামোগত সংকটের পর শিল্পকলা একাডেমিতেও যদি একই ধরনের অস্থায়ী ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বিষয়টি আর দুটো পৃথক প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সমস্যা থাকবে না। তখন প্রশ্ন উঠবে সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
শিল্পকলার নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ তাই দ্রুত করার প্রয়োজন আছে- তবে শুধু দ্রুত নয়, যথাযথভাবেও। একই সঙ্গে প্রয়োজন এমন একটি নীতিগত ব্যবস্থা, যাতে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব বারবার অনিশ্চিত না হয়ে পড়ে। কারণ সংস্কৃতি কোনো অতিরিক্ত আয়োজন নয়, সমাজ তার মানুষ, ইতিহাস, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎকে কীভাবে ধারণ করবে, তারও অংশ।
শিশু একাডেমির অভিজ্ঞতার পর শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান পরিস্থিতি সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনেছে- সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠানগুলো কি স্থায়ী সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে চলবে, নাকি অস্থায়ী দায়িত্ব আর পদায়নের ওপরই তাদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে?