শিশুর হাতে ছাপার কাগজ তুলে দেওয়ার ঘটনা কোনো শিল্পীর জীবনীতে বড় শিরোনাম হয়ে ওঠে না। অথচ রফি হকের শিল্পভুবন বুঝতে এই দৃশ্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ২০০০ সালে জাপানের ফুকুওকা এশিয়ান আর্ট মিউজিয়ামে Artist in Residence হিসেবে কাজ করার সময় তিনি সেখানে শিশুদের ছাপচিত্রের কৌশল শেখানোর কর্মশালায় যুক্ত হয়েছিলেন। ফুকুওকার নিজস্ব নথিতে সেই সময়কার সংবাদ প্রতিবেদনের শিরোনামও সংরক্ষিত আছে- বাংলাদেশের শিল্পী শিক্ষার্থীদের printmaking শেখাচ্ছেন।
শিশুর পৃথিবীর সঙ্গে রফি হকের সম্পর্ক অবশ্য কোনো কর্মশালায় সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর শিল্পে শৈশব এসেছে স্মৃতি হয়ে, আকাঙ্ক্ষা হয়ে, হারিয়ে যাওয়া সময়ের পুনর্নির্মাণ হয়ে। আবার তাঁর শিল্পের আরেক প্রান্তে আছে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধবিরোধিতা, মানুষের নিষ্ঠুরতা, ব্যক্তিগত শোক ও সময়ের সামাজিক অভিঘাত। ফলে তাঁকে শুধু শিশুর শিল্পী বললে তাঁর শিল্পপরিসর ছোট করে দেখা হবে। বরং বলা যায়, মানুষের পৃথিবীকে দেখার পথে শিশুর চোখকে তিনি কখনো হারিয়ে ফেলেননি।
১৯৬৫ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম রফি হকের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে ১৯৯১ সালে এমএফএ করেন, বিশেষায়ন ছিল ছাপচিত্রে। ছাত্রজীবন থেকেই প্রচলিত জীবনের নিরাপদ পথ তাঁকে টানেনি। ভালো ছাত্র ছিলেন, বৃত্তিও পেয়েছেন। কিন্তু শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা এত প্রবল ছিল যে এসএসসি পরীক্ষার খাতার বড় অংশ তিনি ডুডল ও কবিতায় ভরিয়ে দিয়েছিলেন। তার বাবা মারা যান অল্প বয়সে। কবিতা ও আঁকা তাকে নিয়ে যায় কিশোর বাংলা ও পরে দ্য অবজারভার-এর কাজের জগতে। ফলে তার শিল্পী হয়ে ওঠার গল্প শুধু চারুকলায় শিক্ষাগ্রহণের গল্প নয়- সাহিত্য, ছবি, স্মৃতি ও জীবনের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে গড়ে ওঠা এক শিল্পবোধের গল্প।
ছাপচিত্রকে রফি হক কখনো নিছক শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তাঁর ভাষায়, printmaking যোগাযোগের মাধ্যম; পেইন্টিংয়ের তুলনায় প্রিন্ট সহজে পৃথিবীর নানা প্রান্তে পৌঁছানো যায়। এই ভাবনার মধ্যে তার শিল্পদর্শনের একটা দিক ধরা পড়ে। শিল্প তার কাছে নিজের ঘরে রেখে দেওয়ার বিষয় নয়, অনুভূতি ও স্মৃতিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম। ইতালি, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, জাপানসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে তাঁর কাজ সেই যাত্রার সাক্ষ্য বহন করেছে। ২০০০ সালে ফ্রান্সের Chamalieres-এর 5th World Triennial of Print-এ তিনি Honourable Mention পান বলে ঢাকা আর্ট সেন্টারের শিল্পী-তথ্যে উল্লেখ আছে। একই সময়ে দেশে-বিদেশে তাঁর আরও বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মাননা যুক্ত হয় তার শিল্পজীবনে।
রফি হকের শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এসেছে যুদ্ধ ও ধ্বংসের অভিজ্ঞতা থেকে। ১৯৯৮ সালে জাপানে Hiroshima Peace Memorial পরিদর্শন তাঁর শিল্পভাবনায় গভীর প্রভাব ফেলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের ১৯৭১-এর গণহত্যা ও মানুষের দুর্ভোগকে পাশাপাশি অনুভব করেছেন। তাঁর কাজের মধ্যে তখন যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য প্রবল হয়ে ওঠে। Liberation War 1971 নামের ১৯৯৮ সালের paper lithograph সেই পর্বের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
Liberation War 1971–কে শুধু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি হিসেবে দেখলে কাজটির তাৎপর্য কমে যায়। এখানে ছাপচিত্রের পুনরুৎপাদনযোগ্য মাধ্যমটিও গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসের যে স্মৃতি ব্যক্তিগত নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করার প্রয়োজন আছে, রফি হক সেটাকে এমন মাধ্যমে ধরেছেন, যা সহজে মানুষের কাছে যেতে পারে। তার Hiroshima-প্রভাবিত কাজগুলোতে পোড়া, ক্ষতবিক্ষত মানবদেহের যে অভিজ্ঞতা দেখা যায়, সেখানে যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা নয়, মানুষের শরীর ও অস্তিত্বের ওপর নেমে আসা বিপর্যয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধও তার শিল্পে সেই মানবিক বোধের ভেতর দিয়ে এসেছে।
রফি হকের শিল্প শুধু অন্ধকারে থেমে থাকেনি। তার নিজের কথাতেই, একসময়কার গাঢ় বাদামি ও বিষণ্ন রঙের জায়গায় পরে এসেছে অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল রং। মায়ের মৃত্যু তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল, সেই শোক তার কাজে ছিল। পরে তিনি বলেছেন, বিষণ্নতা ও হতাশা থেকে তিনি দূরে সরে এসেছেন। তার শিল্পে তখন স্মৃতি, আনন্দ, ভালোবাসা ও জীবনের প্রতি নতুন আস্থা জায়গা করে নেয়।
এই পরিবর্তন সবচেয়ে সুন্দরভাবে ধরা পড়ে তার Childhood Memories সিরিজে। সেখানে বারবার ফিরে আসে ঘুড়ি। শৈশবে ক্রিকেট ও ফুটবল খেললেও ঘুড়ি ওড়াতে পারতেন না- সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষাই পরে ছবির ভেতর ফিরে এসেছে। সবুজ মাঠ, পুকুর, গাছ তার কাজে এসেছে শৈশবের স্মৃতি থেকে, শিশুকালে যেসব দৃশ্য বিশাল মনে হতো, প্রাপ্তবয়স্ক শিল্পী সেগুলোকে আবার তাঁর ছবির ভেতর ফিরিয়ে এনেছেন। বন্ধুদের আধা-বিমূর্ত মুখ, কৈশোরের প্রেমের স্মৃতিও সেখানে যুক্ত হয়েছে।
এই জায়গাটাই রফি হকের শিল্পে শিশুর পৃথিবীকে আলাদা করে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। তিনি শৈশবকে মিষ্টি নস্টালজিয়ার সাজসজ্জা হিসেবে ব্যবহার করেননি। ঘুড়ি তাঁর কাছে খেলনার ছবি নয়; অপূর্ণ ইচ্ছার স্মৃতি। মাঠ-পুকুর-গাছ শুধু বাংলাদেশের গ্রামীণ দৃশ্য নয়; শিশুর চোখে দেখা পৃথিবীর বিস্ময়কর আকার। ফলে Childhood Memories–এর শৈশব আসলে বড় হয়ে যাওয়া মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকা সেই দৃষ্টির পুনরাবিষ্কার।
শিশুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায় ফুকুওকায়। সেখানে তিনি শুধু নিজের শিল্প নিয়ে কাজ করেননি; অভিভাবক ও শিশুদের নিয়ে paper lithography workshop-ও করেছিলেন। অর্থাৎ শিল্প তাঁর কাছে দর্শকের সামনে প্রদর্শনের বিষয় যেমন, তেমনি হাতে-কলমে ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতাও।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিল্পচর্চার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। ২০১৭ সালে প্রয়াস ও শিল্প-সাহিত্যকেন্দ্রিক সংগঠন শিল্পপ্রভা যৌথভাবে বিশেষ শিশুদের আঁকা ছবি নিয়ে আর্ট ক্যাম্প ও প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল- রফি হক সেই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এসব শিশুর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। এখানে তাঁর শিল্পীর পরিচয়ের সঙ্গে নাগরিক দায়বোধও পাশাপাশি দেখা যায়।
রফি হকের পরিচয় অবশ্য ক্যানভাস বা ছাপচিত্রে শেষ হয় না। তার শিল্প-জার্নালে ছবি, কোলাজ, ডুডল ও লেখা পাশাপাশি এসেছে। ২০১৪ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে তার Journal of an Artist প্রদর্শনীতে এই জার্নালভিত্তিক কাজের নির্বাচিত অংশ প্রদর্শিত হয়েছিল। সেখানে ব্যক্তিগত জীবন যেমন আছে, তেমনি আছে চারপাশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার নথি। বাংলা ভাষার প্রতি তার আগ্রহ তাকে শিল্পলেখার জগতেও সক্রিয় করেছে। শিল্পপ্রভা শিল্পপত্রের সম্পাদক হিসেবে তিনি বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পচর্চা নিয়ে কাজ করেছেন।
তার শিল্পজীবনের এই বিস্তারটিই রফি হককে আলাদা করে। মুক্তিযুদ্ধের ক্ষত থেকে Hiroshima, ব্যক্তিগত শোক থেকে কৈশোরের প্রেম, ঘুড়ি ওড়াতে না পারার আক্ষেপ থেকে সবুজ মাঠ-পুকুরের বিশালতা- সবকিছু তার শিল্পে পাশাপাশি থাকে। কখনো ছাপচিত্রে, কখনো ক্যানভাসে, কখনো জার্নালের পাতায়। বিষণ্নতা তার কাজে এসেছে, কিন্তু বিষণ্নতাকে তিনি শেষ কথা হতে দেননি।
শিশুর পৃথিবীর সঙ্গে রফি হকের সম্পর্ক তাই নিছক শিশুদের জন্য ছবি আঁকার সম্পর্ক নয়। বরং নিজের ভেতরের সেই বিস্ময়, আকাঙ্ক্ষা, খেলা, ভয়, ভালোবাসা ও অসম্পূর্ণতাকে তিনি শিল্পের ভাষায় ধরে রেখেছেন, যা বয়স বাড়লেও মানুষের ভেতর থেকে পুরোপুরি মুছে যায় না। তার ঘুড়ি সেই হারানো আকাশের দিকে ফিরে তাকায়, তার মুক্তিযুদ্ধের কাজ স্মরণ করায় ইতিহাসের ক্ষত, তার ছাপচিত্র সেই স্মৃতিকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।
রফি হকের শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়তো এখানেই- তিনি শিশুকে শুধু ছবির বিষয় করেননি, শিশুর চোখ দিয়ে পৃথিবীকে আবার দেখার সুযোগ তৈরি করেছেন। আর সেই পৃথিবী কেবল রঙিন নয়, কেবল আনন্দেরও নয়। সেখানে যুদ্ধ আছে, মৃত্যু আছে, ব্যক্তিগত শোক আছে- আবার ঘুড়ি আছে, মাঠ আছে, বন্ধুর মুখ আছে, অপ্রাপ্তির মধ্যেও জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর সাহস আছে।
এই বহুমাত্রিকতার কারণেই রফি হক শিশুর পৃথিবীর নিবেদিত শিল্পী- শুধু শিশুদের জন্য নয়, মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকা শিশুর জন্যও।