সিরাজগঞ্জে বন্ধের পথে ৪৫ হাজার তাঁত, কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ৯৬ হাজার শ্রমিক

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা

সারাদেশ

বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। জেলার প্রায় ৪৫ হাজার তাঁত

2026-09-27T16:06:02+00:00
2026-09-27T16:06:02+00:00
  মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সিরাজগঞ্জে বন্ধের পথে ৪৫ হাজার তাঁত, কাজ হারানোর ঝুঁকিতে ৯৬ হাজার শ্রমিক
সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:০৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাজারে কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প। জেলার প্রায় ৪৫ হাজার তাঁত বর্তমানে বন্ধ, অচল বা কম উৎপাদনে রয়েছে। এতে নিয়মিত কাজের সংকটে পড়েছেন আনুমানিক ৯৬ হাজার ২৫০ শ্রমিক।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চারটি বেসিক সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় মোট তাঁতের সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭০০। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরেই প্রায় ৩৮ হাজার ৫০০ তাঁত উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, মোট তাঁতের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বর্তমানে স্বাভাবিক উৎপাদনে নেই।

তাঁত বন্ধের সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে বেলকুচি। সেখানে ৭০ হাজার তাঁতের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার বন্ধ। সিরাজগঞ্জ সদরে ৩২ হাজার ১৫০টির মধ্যে বন্ধ রয়েছে ১০ হাজার, শাহজাদপুরে ৩০ হাজার ৩৫০টির মধ্যে ১০ হাজার এবং উল্লাপাড়ায় ২৫ হাজার ২০০টির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ তাঁত উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

বিদ্যুৎ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উল্লাপাড়ায় ৪৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩২ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি ছিল ১২ মেগাওয়াট। বেলকুচিতেও চাহিদার তুলনায় প্রায় ৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

উল্লাপাড়ার বালসাবাড়ি এলাকার পাওয়ারলুম শ্রমিক আব্দুর রউফ বলেন, আগে দুটি তাঁতে দিনে আটটি লুঙ্গি তৈরি হলেও এখন উৎপাদন নেমে এসেছে চারটিতে। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে তাঁর সাপ্তাহিক আয় ৪ হাজার টাকা থেকে কমে প্রায় ২ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। জেনারেটর চালানোর বাড়তি খরচ বহন করাও মালিকদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

শুধু বিদ্যুৎ নয়, সুতা, রংসহ বিভিন্ন কাঁচামালের দামও বেড়েছে। উল্লাপাড়ার কাপড় ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলামের ভাষ্য, দুই বছর আগে তাঁর ১২টি পাওয়ারলুম থেকে সপ্তাহে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার কাপড় বিক্রি হতো। এখন সেই বিক্রি নেমে এসেছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকায়। জেনারেটর চালাতে প্রতিদিন অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

তাঁত মালিক ইব্রাহিম হোসেন জানান, তিন বছর আগে তাঁর ১২টি তাঁত চালু ছিল। বর্তমানে মাত্র দুটি চলছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং কাপড়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় লোকসান এড়াতে অন্যগুলো বন্ধ রাখতে হয়েছে।

রায়গঞ্জের তাঁত মালিক মোছা. ফাতিমা ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও কাঁচামালের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় তাঁত চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদন করেও আগের মতো লাভ হচ্ছে না।

এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনেও। নিয়মিত কাজ না থাকায় অনেকে তাঁতশিল্প ছেড়ে অটোরিকশা চালানো, কৃষিকাজ, হোটেলসহ বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। দীর্ঘদিন তাঁতশিল্পে কাজ করা মোশারফ হোসেনও কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হোটেলে খাবার পরিবেশনের কাজ নিয়েছেন।

সিরাজগঞ্জের অন্যতম বড় কাপড়ের বাজার শাহজাদপুরের হাটেও কমেছে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতি। হাট কমিটির সদস্য মাসুম মিয়ার দাবি, একসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল এমনকি ভারত থেকেও ক্রেতারা আসতেন। বর্তমানে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা আগের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।

বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রধান কাপড়ের বাজারগুলোতে আগে প্রতি সপ্তাহে ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকায়। ফলে সাপ্তাহিক লেনদেনে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।

তবে ঈদকে ঘিরে কিছুটা আশার কথাও বলছেন তাঁত মালিকরা। তাঁদের মতে, ঈদের আগে লুঙ্গি, গামছা, শাড়িসহ বিভিন্ন কাপড়ের চাহিদা বাড়লে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা কিছু তাঁত আবার চালু হতে পারে। তবে উৎসবের পর বাজারে চাহিদা কমে গেলে উৎপাদনও আবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সিরাজগঞ্জ তাঁত বোর্ডের ফিল্ড সুপারভাইজার ইমরানুল হক বলেন, বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে কিছু তাঁত সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। চাহিদা বাড়লে সেগুলো আবার চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁতশিল্পের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তাঁত মালিক ও শ্রমিকদের দাবি, শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, সুতা-রংসহ কাঁচামালের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং তাঁতের কাপড়ের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। নইলে সাময়িকভাবে বন্ধ থাকা অনেক তাঁত ভবিষ্যতে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: