সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে জমা হওয়া টাকা এখন থেকে প্রতিদিন গণনা করা হবে। সংগৃহীত অর্থের ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজের জন্য ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে। বাকি ৬৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হবে মাজারের দৈনন্দিন খরচ ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে।
মঙ্গলবার রাতে সিলেট সার্কিট হাউসে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটির সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির সদস্যরা অংশ নেন।
সভা শেষে কমিটির সদস্য সচিব ও সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, দানবাক্সের অর্থ থেকে ৩৫ শতাংশ মাজারের উন্নয়নকাজে ব্যবহারের জন্য সোনালী ব্যাংকের একটি হিসাবে জমা রাখা হবে। ওই হিসাব জেলা প্রশাসক ও মাজারের মোতাওয়াল্লির যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হবে।
বাকি ৬৫ শতাংশ অর্থ দিয়ে মাজারের নিয়মিত পরিচালন ব্যয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হবে।
দানবাক্সের টাকা গণনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একজন ম্যানেজার নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে। জেলা প্রশাসক জানান, অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন অথবা অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা পদটিতে নিয়োগ পেতে পারেন। পাশাপাশি একজন হিসাবরক্ষক ও একজন অফিস সহকারী নিয়োগ দেওয়া হবে।
মাজারের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জন্য সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসক ওই কমিটির আহ্বায়ক থাকবেন। কমিটিতে সিটি করপোরেশন, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিলেট মহানগর পুলিশ, সিলেট জেলা পরিষদের একজন করে প্রতিনিধি এবং পুলিশ সুপার থাকবেন। মাজারের মোতাওয়াল্লি সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নিয়োগ পাওয়া ম্যানেজার কমিটির সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন।
এই কমিটি মাজারের নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
এর আগে মাজারের দানবাক্সের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের পর গত ২৩ জুন আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এক মাসের মধ্যে কমিটিকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সুপারিশ দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় আড়াই মাস পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কমিটি।
জানা গেছে, গত ১৮ জুন মাজারের পুরোনো দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে মাজারে দান করা নগদ অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রী রাখার ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগও সিলগালা করা হয়। বিষয়টি নিয়ে সিলেটজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এর মধ্যেই ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে সংযুক্ত করা হয়। পরদিন তার উপস্থিতিতে দানবাক্স সিলগালার চার দিন পর জনসমক্ষে তালা খুলে টাকা গণনা করা হয়।
২২ জুন প্রথম দফায় দানবাক্স থেকে পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এর সঙ্গে জেলা প্রশাসনের তহবিল থেকে ৫ লাখ টাকার চেক যুক্ত হওয়ায় মোট অর্থ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। এ সময় স্বর্ণালঙ্কার ও বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া যায়।
এরপর ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। সেখানেও বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং স্বর্ণ-রৌপ্যের সামগ্রী পাওয়া যায়।
তৃতীয় দফায় ১৫ আগস্ট দানবাক্স ও মানতের ডেগ খুলে পাওয়া যায় ৭০ লাখ ৮৮ হাজার ৬৭২ টাকা। সর্বশেষ ১৯ সেপ্টেম্বর দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৯৬৬ টাকা। সেদিনও দেশি-বিদেশি মুদ্রার পাশাপাশি স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলঙ্কার পাওয়া যায়।
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে মাজারের দানবাক্সের অর্থ সংগ্রহ, গণনা, ব্যাংকে জমা এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি নির্ধারিত কাঠামো চালু হচ্ছে।