গাজীপুরের নাওজোড় হাইওয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মহাসড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আটক করে সরকারি রসিদ ছাড়াই ২ হাজার ৬০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী চালকদের দাবি, প্রতিদিন গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি অটোরিকশা আটক করে এভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, আটক করা অটোরিকশার চালকদের কাছ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা নেওয়া হয় এবং সেই অর্থ ইউক্যাশের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা হয়।
বুধবার সকালে নাওজোড় হাইওয়ে থানায় গিয়ে দেখা যায়, থানার ভেতরের প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে অর্ধশতাধিক আটক ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রাখা রয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও আশপাশের এলাকা থেকে নিয়মিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আটক করা হয়। পরে সেগুলো নাওজোড় হাইওয়ে থানায় নিয়ে দিনভর আটকে রাখা হয়। অভিযোগ রয়েছে, গাড়ি ছাড়াতে প্রতিটি অটোরিকশার চালকের কাছ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা নেওয়া হয়।
চালকদের অভিযোগ, টাকা দেওয়ার বিপরীতে তাদের কোনো সরকারি রসিদ দেওয়া হয় না। বরং পুলিশের একটি মোবাইল নম্বর থেকে টাকা পাওয়ার বিষয়ে চালকের মোবাইলে মেসেজ পাঠানো হয়। ওই মেসেজকেই অনেক ক্ষেত্রে গাড়ি ছাড়ানোর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অটোরিকশাচালক মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আগে একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা চালানো শুরু করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারা অটোরিকশা আটক করে থানায় নিয়ে যেতে বলেন। পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ২ হাজার ৬০০ টাকা দেওয়ার পর গাড়ি ছাড়িয়ে নিতে হয়।
আমিনুল বলেন, অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে গাড়ি ছাড়ানোর পর মাত্র চার দিন চালাতে পেরেছেন। এরপর আবার গাড়ি আটক করা হলে নতুন করে টাকা জোগাড় করতে হয়েছে।
আরেক চালক মো. সোহাগ মিয়া বলেন, মাসে তিন থেকে চারবার পর্যন্ত তাঁর গাড়ি আটক করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, টাকা না দিলে গাড়ি থানাতেই পড়ে থাকে। ঋণ করে গাড়ি ছাড়ানোর পর আবার কখন আটক করা হবে, সেই চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
মো. শাহিন আহমেদ নামে আরেক চালক বলেন, দোকানের দেনা শোধ করার জন্য অটোরিকশা চালানো শুরু করেছিলেন। কিন্তু গাড়ি আটকের পর টাকা দিতে হওয়ায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তাঁর।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, চন্দ্রা এলাকা থেকে জব্দ করা অটোরিকশাগুলো নাওজোড় হাইওয়ে থানায় পৌঁছে দিতে কয়েকজন ব্যক্তি কাজ করেন। তাদের গাড়িপ্রতি ৩০০ টাকা করে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে নাওজোড় হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আলী খান দাবি করেন, তারা কমিউনিটি পুলিশের সদস্য এবং আটক করা অটোরিকশা থানায় আনার কাজে সহযোগিতা করেন।
চালকদের অভিযোগ, কখনো মামলা, আবার কখনো রেকার বিলের কথা বলে টাকা নেওয়া হয়। সরকারি চালান বা রসিদ না দেওয়ায় এসব টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে নাওজোড় হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাফর আলী খান বলেন, প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০টি অটোরিকশা আটক করা হয়। তাদের ২ হাজার ৬০০ টাকা করে জরিমানা করা হয়।
তিনি দাবি করেন, জরিমানার টাকা অটোরিকশাচালকরা ইউক্যাশের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেন। থানায় নগদ টাকা নেওয়া হয় না বলেও জানান তিনি।
অটোরিকশাগুলো চন্দ্রা থেকে কমিউনিটি পুলিশের মাধ্যমে থানায় আনা হয় জানিয়ে ওসি বলেন, তাদের কিছু অর্থ দিতে হয়।
এদিকে নাওজোড় হাইওয়ে থানার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর রিজিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার বলেন, অভিযোগ থাকলে লিখিতভাবে জানাতে হবে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে দেখা হবে।
মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল আইনগতভাবে নিষিদ্ধ—এমন অবস্থানের মধ্যে নিয়মিত গাড়ি আটক এবং জরিমানা আদায়ের বিষয়টি নিয়ে চালকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং জরিমানার অর্থ সরকারি কোষাগারে যথাযথভাবে জমা হচ্ছে কি না, তা তদন্তে পরিষ্কার হবে।