অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে অভিযানে জব্দ করা ড্রেজার মেশিনের উন্মুক্ত নিলামকে কেন্দ্র করে বান্দরবানের লামায় চরম হট্টগোল ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিলামে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অভিযানে জব্দ করা কয়েকটি ভালো ড্রেজার মেশিন নিলামস্থলে না এনে সেগুলোর পরিবর্তে জরাজীর্ণ ও অকেজো মেশিন রাখা হয়েছে। পরে নিখোঁজ দুটি ড্রেজার উপজেলা প্রশাসনের এক অফিস সহায়কের বাড়িতে পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেছেন তারা।
জানা গেছে, গত কয়েক মাসে লামা উপজেলা প্রশাসন অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করে ১৩টি ড্রেজার মেশিন ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম জব্দ করে। সরকারি বিধি অনুযায়ী সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টায় জব্দকৃত ড্রেজারগুলো উন্মুক্ত নিলামে তোলার সময় নির্ধারণ করা হয়। নিলামে স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় অর্ধশত ব্যবসায়ী অংশ নেন।
তবে নির্ধারিত সরকারি মূল্যের দর না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত নিলাম স্থগিত করা হয়। নিলাম স্থগিত হওয়ার পর জব্দকৃত ড্রেজার নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যবসায়ীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
নিলামে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ী আরিফুল ইসলাম ও মো. আইয়ুবের দাবি, অভিযানের সময় জব্দ করা কয়েকটি ভালো ড্রেজার নিলামস্থলে ছিল না। সেগুলোর পরিবর্তে ছোট, পুরোনো ও ভাঙাচোরা মেশিন রাখা হয়। এসব মেশিনের দাম কয়েক লাখ টাকা নির্ধারণ করা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহায়ক মো. সোহেল রাতের আঁধারে দুটি ভালো ড্রেজার সরিয়ে নিজের বাড়িতে রেখে সেখানে অকেজো দুটি মেশিন রাখেন। নিলামের সময় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা ও হট্টগোল শুরু হয়।
পরে কয়েকজন ব্যবসায়ী ইউএনও কার্যালয় থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে অবস্থিত সোহেলের বাড়িতে গিয়ে দুটি ড্রেজার দেখতে পান বলে দাবি করেন। তাদের অভিযোগ, নিলামস্থলে না থাকা ড্রেজারের সঙ্গে ওই মেশিনগুলোর মিল রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, “একই ধরনের ড্রেজার মেশিন অনেকের কাছেই থাকতে পারে। সোহেলের বাড়িতে থাকা ড্রেজারটি প্রশাসনের জব্দ করা মেশিন—এটি কীভাবে নিশ্চিত হওয়া গেল?”
তিনি আরও বলেন, একটি অসাধু সিন্ডিকেট সরকারি কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করতেই এসব ইস্যু তৈরি করছে।
এদিকে, অফিস সহায়ক সোহেলের বিরুদ্ধে বদলির আদেশ অমান্য করে পূর্বের কর্মস্থলে অবস্থানেরও অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও দাপ্তরিক স্বচ্ছতার স্বার্থে তাকে আলীকদম উপজেলায় বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তিনি সেখানে যোগ দেননি। বরং আগের কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে মেশিন কেনাবেচা ও আর্থিক লেনদেন নিয়ে সোহেলের সম্পৃক্ততার অভিযোগও সামনে এসেছে। সম্প্রতি স্থানীয়দের সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ও অডিও যোগাযোগ প্রকাশ পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, জব্দকৃত সরকারি মালামাল নিলামের আগে কোথায়, কী অবস্থায় এবং কার হেফাজতে ছিল—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো মেশিন সরিয়ে নেওয়া বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বান্দরবান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সানিউল ফেরদৌস বলেন, “লিখিত অভিযোগ বা নিউজ হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ ঘটনায় জব্দকৃত ড্রেজারগুলোর তালিকা, নিলামস্থলে প্রদর্শিত মেশিন এবং সোহেলের বাড়িতে পাওয়া মেশিনগুলোর বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিস্তারিত যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।