নদীভাঙনের কবল থেকে বিদ্যালয় রক্ষায় প্রায় ২০ লাখ টাকার জরুরি প্রকল্প শুরু হলেও কাজের মান ও বাস্তবায়ন নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সরকারি প্রাক্কলন (এস্টিমেট) অনুযায়ী কাজ না করে ঠিকাদার ইচ্ছেমতো কাজ করছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। পাইলিং, জিও-ব্যাগের ওজন ও ডাম্পিংসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের মানুষ।
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, মগড়া নদীর ভাঙন থেকে বাগজান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রক্ষায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১৯ লাখ ৮২ হাজার ২৮২ টাকা ব্যয়ে ৮০ মিটার এলাকায় জরুরি ভাঙন রোধ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, নদীতীর রক্ষায় ৫২ মিটার শক্ত কাঠের বল্লা এবং ৮২ মিটার দৈর্ঘ্যে কমপক্ষে ৪১টি ব্যারাক বাঁশের পাইলিং করার কথা। পাশাপাশি ওয়ালিং পিস ২০ মিমি নাট-বল্টু দিয়ে সংযুক্ত করা এবং ২৫০ কেজি ওজনের ৩ হাজার ১২৫টি জিও-ব্যাগ ডাম্পিং ও ১৭৫ কেজি ওজনের ১ হাজার ২১০টি জিও-ব্যাগ প্লেসিং করার নির্দেশনা রয়েছে।
এ ছাড়া জিও-ব্যাগে শুকনো বালি ভর্তি করে নির্ধারিত ওজন নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রাক্কলনে উল্লেখ রয়েছে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিংবা এলাকাবাসীকে সরকারি প্রাক্কলন বা কাজের বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি। ফলে ঠিকাদার নির্ধারিত সিডিউল অনুসরণ করছেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বাগজান গ্রামের আব্দুল লতিফ, রাসেল ও সাগরসহ স্থানীয় কয়েকজন অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘদিনের নদীভাঙনে বিদ্যালয়ের জায়গার পাশাপাশি একটি শ্রেণিকক্ষও নদীগর্ভে চলে গেছে। এ অবস্থায় সংবাদ প্রকাশের পর জরুরি ভিত্তিতে প্রকল্প নেওয়ায় তারা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু কাজের ধরন দেখে এখন তারা হতাশ।
তাদের অভিযোগ, সঠিকভাবে পাইলিং ও নির্ধারিত ওজনের জিও-ব্যাগ ব্যবহার না করলে আগামী বর্ষায় কাজ ধসে নদীতে চলে যেতে পারে। এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের পরও বিদ্যালয়টি ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে না।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাদেকুর রহমান বলেন, কাজ দ্রুত শুরু করায় আমরা আশাবাদী হয়েছিলাম। কিন্তু ঠিকাদার প্রকল্পের কোনো তথ্য আমাদের দেখাননি। শুধু একদিন আমাকে দিয়ে ৪৫৯টি ভেজা বালুভর্তি জিও-ব্যাগ গণনা করিয়েছেন।
তবে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি উজ্জ্বল চৌধুরী। তিনি বলেন, ইমার্জেন্সি কাজে শুকনা বালু দেওয়া হয় না। ডাম্পিংয়ের সময় কিছু বস্তার ওপর বালু-মাটি পড়েছে। এগুলো সরানো সম্ভব নয়। এগুলো থাকলে ডাম্পিং একটু লুজ হবে।
অন্যদিকে, সরকারি প্রাক্কলনপত্রে জিও-ব্যাগ শুকনো বালি দিয়ে ভর্তি করে ওজন নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্পের তদারককারী কর্মকর্তা ও নেত্রকোনা পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম হচ্ছে না। সবকিছু এস্টিমেট অনুযায়ীই হচ্ছে।
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমি জানি না, স্যার জানেন।
এ বিষয়ে মদন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে বলা হবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে, প্রকল্পের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন ও জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি অর্থের অপচয় বন্ধে প্রকল্পটির কাজ দ্রুত সরেজমিনে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি সরকারি প্রাক্কলন ও নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী কাজ নিশ্চিত করে বিদ্যালয় ও নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।