কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার ১২৪ মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত এবং ১২টি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মো. আনিছুর রহমানকে ফের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ‘বিশ্বাস ফাউন্ডেশন’ ও এর সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ সংগ্রহ করে আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
বুধবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আনিছুর রহমান কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়নের সদরপুর গ্রামের মৃত ইব্রাহিম বিশ্বাসের ছেলে। ২০০৬ সালে নন্দলালপুর ইউনিয়নের আলাউদ্দিননগর এলাকায় ‘বিশ্বাস ফাউন্ডেশন’-এর নামে ‘বিশ্বাস সঞ্চয় ঋণদান ও সমবায় সমিতি লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন তিনি।
পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আলাউদ্দিননগর থেকেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়। পরে কুষ্টিয়াসহ রাজবাড়ী, পাবনা, ঝিনাইদহ ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় কয়েকশ শাখা খোলা হয়।
এসব শাখায় গ্রাহকদের বিভিন্ন মেয়াদের ডিপিএস করার পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর দ্বিগুণ টাকা ফেরতের প্রলোভন দেখানো হতো। এভাবে হাজার হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কয়েক বছরে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার পর আনিছুর রহমান ওই অর্থ দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমি, বাড়ি, গাড়িসহ নানা সম্পদ গড়ে তোলেন।
২০২৩ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে নিজেদের বিনিয়োগের অর্থ ফেরতের জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। এর কয়েক মাস পর, ওই বছরের নভেম্বরে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে আনিছুর রহমান আত্মগোপনে চলে যান।
এরপর ২০২৪ সালের শুরুর দিকে কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে একের পর এক মামলা হয়। এসব মামলায় আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এর মধ্যে ১২টি মামলায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও হয় তার।
২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আনিছুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কুষ্টিয়া কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে একই বছরের ৭ আগস্ট দুপুরে কুষ্টিয়া কারাগারের প্রধান ফটক ভেঙে আনিছুর রহমানসহ ১০৪ আসামি পালিয়ে যান। এরপর থেকেই তিনি পলাতক ছিলেন।
কুমারখালী থানার এসআই সোহাগ শিকদার বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও র্যাবের সহযোগিতায় অভিযান চালিয়ে আনিছুর রহমানকে ঢাকার বিমানবন্দর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযানে এএসআই শরিফুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাশেদুল ইসলামও ছিলেন।
তিনি জানান, আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আদালতে ১২৪টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত।
আনিছুর রহমান গ্রেপ্তার হয়েছেন—এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন এলাকার ভুক্তভোগীরা কুমারখালী থানায় আসতে শুরু করেন। পুলিশ তাদের আদালতে গিয়ে আইনগতভাবে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছে।
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মাছপাড়া এলাকার ৬৪ বছর বয়সী আব্দুল মাজেদ বলেন, সারা জীবন গার্মেন্টসে চাকরি করে তিনি প্রায় সাড়ে ১১ লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। চার বছরে টাকা দ্বিগুণ হবে—এমন আশ্বাসে তিনি আনিছুর রহমানের প্রতিষ্ঠানে টাকা জমা দেন। কিন্তু দুই বছর পরই টাকা নিয়ে আনিছুর রহমান পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, মানুষের কাছ থেকে প্রলোভনের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আনিছুর রহমানের বিরুদ্ধে। আগেও তাকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। পরে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ায় তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখন তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।