সাতক্ষীরার তালা উপজেলার ইসলামকাটি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম ও ১০ম শ্রেণির ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ছাত্রীদের জেলার বাইরে নিয়ে গিয়ে গোপনে মৌলভি ডেকে এসব বিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর বৃহস্পতিবার ১৩ ছাত্রী, তাদের অভিভাবক ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে ডাকা হয়। তবে তাদের মধ্যে আটজন ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকেরা উপস্থিত হন।
সাতক্ষীরা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার জানান, গত সপ্তাহে বিদ্যালয়টির ১১ ছাত্রীর গোপনে বিয়ে হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এরপর ইউএনও বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন এবং তদন্তে ১১ জনের পরিবর্তে মোট ১৩ ছাত্রীর বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়া যায়।
তিনি জানান, উপস্থিত অভিভাবকেরা বিয়ের কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরার বাইরে নিয়ে গিয়ে গোপনে এসব বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজন ছাত্রী স্বামীর সঙ্গে জেলার বাইরে গিয়ে গার্মেন্টসে কাজ করছেন বলেও জানা গেছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু তালেব বলেন, গত দুই বছরের মধ্যে এসব শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়েছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সভা-সেমিনারের মাধ্যমে অভিভাবকদের বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করে আসছে। তবে অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখায় আগে থেকে জানা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, বিয়ের পরও আটজন শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে আসছে। অন্য শিক্ষার্থীরাও বিদ্যালয়ে আসবে বলে প্রশাসনের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপস্থিত অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। এতে মেয়েদের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়া এবং তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একজন কর্মকর্তাকে।
তালার ইউএনও জান্নাতুল আফরোজ (স্বর্ণা) বলেন, অভিভাবকদের স্বীকারোক্তির পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখা এবং ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বাবার বাড়িতে রাখার বিষয়ে মুচলেকা নেওয়া হয়েছে। তাদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখার জন্য একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ইসলামকাটি ইউনিয়নের সরকারি বিবাহ নিবন্ধককে (কাজি) ডেকে কৈফিয়ত চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর।
সরকারি বিবাহ নিবন্ধক থাকা সত্ত্বেও কীভাবে সাতক্ষীরার বাইরে থেকে লোক এনে এসব বিয়ে সম্পন্ন করা হলো এবং তিনি বিষয়টি জানতেন কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে।
সাতক্ষীরা জেলা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সাকিব হোসেন বাবলা জানান, গত ৩১ আগস্ট বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি ১১ শিক্ষার্থীর বাল্যবিবাহের তথ্য জানতে পারেন। পরে শিক্ষকদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জেলা প্রশাসন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের ‘স্মল এরিয়া এস্টিমেশন’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাল্যবিবাহের হারের দিক থেকে সাতক্ষীরার অবস্থান দেশের জেলাগুলোর মধ্যে অষ্টম। জেলাটিতে ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বাল্যবিবাহের হার ৬২ শতাংশের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়ের এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলের বিয়ে বাল্যবিবাহ হিসেবে বিবেচিত। আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহ করা, সম্পাদন বা পরিচালনার জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।