দীর্ঘ তিন মাসের নীরবতা ভেঙে আবারও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে জীববৈচিত্র্য ও বনজ সম্পদ রক্ষায় ৯১ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে গত ১ সেপ্টেম্বর খুলে দেওয়া হয়েছে সুন্দরবনের দুয়ার। এরপর থেকেই প্রকৃতির টানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কয়েক দিনের মধ্যেই বাগেরহাটের করমজল পর্যটনকেন্দ্রে দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। বিশেষ করে ছুটির দিনে সকাল থেকেই পর্যটকদের ভিড়ে জমজমাট হয়ে উঠছে সুন্দরবনের প্রবেশদ্বারখ্যাত এই পর্যটনকেন্দ্র। একের পর এক পর্যটকবাহী নৌযান ভিড়ছে ঘাটে।
পরিবার-পরিজন, বন্ধু কিংবা বিভিন্ন সংগঠনের দল নিয়ে সুন্দরবনের অপরূপ প্রকৃতি উপভোগ করতে আসছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ফুটট্রেইলে হাঁটছেন, কেউ নদী-খালের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন, আবার কেউ বানর, হরিণসহ বনের বন্যপ্রাণীর দেখা পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন ছবি ও ভিডিও ধারণে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পর্যটক প্রবেশসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা ছিল। দীর্ঘ ৯১ দিন পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে পর্যটকদের জন্য আবারও উন্মুক্ত হয় সুন্দরবন।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে পর্যটকদের কোলাহল না থাকায় বন ও বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পরপরই প্রকৃতিপ্রেমীদের আগ্রহে আবারও সরব হয়ে উঠেছে করমজলসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র।
করমজলে গিয়ে দেখা যায়, পর্যটকবাহী নৌযানের আসা-যাওয়ায় ব্যস্ত ঘাট। নৌযান থেকে নেমে দলবেঁধে পর্যটকরা প্রবেশ করছেন ফুটট্রেইলে। কেউ বনের গাছপালা দেখছেন, কেউ খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। শিশুদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশি বানর ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী দেখার দিকে।
অনেকের কাছে নৌযাত্রাও ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। নদীর দুই পাশে সবুজ বন, ছোট ছোট খাল আর সুন্দরবনের নৈসর্গিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে নৌযানে চলার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দিচ্ছে।
মোরেলগঞ্জ থেকে আসা পর্যটক এস এম রিফাতুল ইসলাম জনি বলেন, সুন্দরবন শুধু ঘোরার জায়গা নয়, এটি প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি অনন্য সুযোগ। করমজলে এসে মনে হচ্ছে শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একেবারে অন্য এক জগতে চলে এসেছি।
বরিশাল থেকে আসা পর্যটক হোসেন সরদার বলেন, অনেক দিন ধরে সুন্দরবনে আসার পরিকল্পনা করছিলাম। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর সুযোগ পেয়ে চলে এসেছি। নৌপথে আসার সময় নদীর দুই পাশের দৃশ্যই ছিল অসাধারণ।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক নিলিমা রানী নিল বলেন, সুন্দরবন শুধু ঘোরার জায়গা নয়, এটি প্রকৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করার একটি অনন্য সুযোগ। করমজলে এসে মনে হচ্ছে শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে একেবারে অন্য এক জগতে চলে এসেছি।
সিলেট থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক আসমা আক্তার বলেন, শিশুদের নিয়ে এমন একটি জায়গায় আসতে চেয়েছিলাম, যেখানে তারা বইয়ে পড়া প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীকে কাছ থেকে দেখতে পারবে। করমজলে এসে আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি ভালো লাগছে।
দীর্ঘ তিন মাস পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ থাকায় করমজল ও আশপাশের পর্যটননির্ভর ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। পর্যটক ফিরতে শুরু করায় সেই স্থবিরতা কাটতে শুরু করেছে।
পর্যটকদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নৌযান চালক, বোট মালিক, পর্যটক গাইড, খাবারের দোকানসহ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততাও বেড়েছে। এতে সুন্দরবনকেন্দ্রিক স্থানীয় অর্থনীতিতেও ফিরেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, দীর্ঘ তিন মাস বন্ধ থাকার পর ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হয়েছে। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য স্বাভাবিক পরিবেশে থাকার সুযোগ পেয়েছে।
তিনি বলেন, শুরুতে আবহাওয়ার কারণে পর্যটকের উপস্থিতি কিছুটা কম ছিল। তবে আবহাওয়া অনুকূলে আসায় প্রতিদিনই পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে ছুটির দিনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে অনেক পর্যটক করমজলে আসছেন।
পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, করমজল এমন একটি পর্যটনকেন্দ্র, যেখানে অল্প সময়ের মধ্যেই সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের স্বাদ পাওয়া যায়। নদীপথে করমজলে আসার পুরো যাত্রাটিও পর্যটকদের জন্য আলাদা অভিজ্ঞতা।
ফুটট্রেইলে হাঁটতে হাঁটতে সুন্দরবনের গাছপালা, খাল, বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে। পরিবার নিয়ে ভিন্ন ধরনের সময় কাটানো কিংবা সন্তানদের প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার ক্ষেত্রেও করমজলের গুরুত্ব রয়েছে।
পর্যটকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, সুন্দরবনকে শুধু দেখবেন না—সুন্দরবনকে ভালোবাসবেন এবং রক্ষা করবেন। বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না এবং বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করা যাবে না।
তিনি বলেন, একজন সচেতন পর্যটকের সামান্য দায়িত্বশীল আচরণও সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সুন্দরবন আমাদের গর্ব, আমাদের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। পর্যটকরা এখানে এসে আনন্দ করবেন, প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবেন—এটাই আমরা চাই। তবে সেই আনন্দ যেন কোনোভাবেই বনের ক্ষতির কারণ না হয়, বলেন তিনি।
সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এটি অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং উপকূলীয় পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঢাল। নদী, খাল, সবুজ বন ও বন্যপ্রাণীর অপূর্ব সমন্বয় এই বনকে দিয়েছে অনন্য বৈশিষ্ট্য।
দীর্ঘ তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে করমজলে পর্যটকদের ভিড় যেন আবারও জানান দিচ্ছে সুন্দরবনের প্রতি মানুষের গভীর আকর্ষণের কথা। শহুরে ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে প্রকৃতির কাছে সময় কাটানো, বন্যপ্রাণী দেখা কিংবা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্মরণীয় একটি দিন কাটানোর সুযোগ পেতে আবারও সুন্দরবনমুখী হচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
তবে পর্যটকদের এই আগ্রহের সঙ্গে সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা এবং বন বিভাগের নির্দেশনা মেনে চললেই এই অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব।