সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে উৎসবমুখর পরিবেশে তিন দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়েছে। গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ধরে রাখতে আয়োজিত এ নৌকা বাইচকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। নদীর দুই তীরে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতিতে পুরো এলাকা পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) উপজেলার মুকুন্দগাঁতী ও ক্ষিদ্রমাটিয়া গ্রামের উদ্যোগে এবং ঢাকা ব্যাংক পিএলসির অর্থায়নে এ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।
ফাইনালে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পূর্বানী গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান আলহাজ আব্দুল হাই সরকার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক হাজী আলতাফ হোসেন প্রামাণিক।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনের সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম খান আলীম।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আফরিন জাহান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও পূর্বানী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুল ইসলাম সরকার (সোহেল), সহকারী পুলিশ সুপার (বেলকুচি সার্কেল) শহিদুল ইসলাম, বেলকুচি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান, বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোক্তারুজ্জামানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি হেলাল উদ্দিন প্রামাণিক ও উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব আলম প্রামাণিক।
নৌকা বাইচ উপলক্ষে সকাল থেকেই নদীর দুই তীরে স্থানীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। দুপুরের পর দর্শনার্থীদের উপস্থিতি আরও বেড়ে যায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ নৌকা বাইচ উপভোগ করেন।
প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া সুসজ্জিত নৌকাগুলো ঢাক-ঢোল ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নদীর পানিতে দ্রুতগতিতে ছুটে চললে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। নৌকার মাঝিদের বৈঠার ছন্দ, দর্শকদের উচ্ছ্বাস এবং বাদ্যযন্ত্রের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়। প্রিয় দল বা নৌকার পক্ষে দর্শকদের উল্লাস পুরো আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
আয়োজকরা জানান, নৌকা বাইচ গ্রামবাংলার একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যেতে বসা এ ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে আনন্দ, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। তিন দিনব্যাপী প্রতিযোগিতার বিভিন্ন ধাপ শেষে রোববার বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় দর্শনার্থীরা বলেন, একসময় বর্ষাকালে নদী-নালা ও খাল-বিলে নিয়মিত নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে এ ধরনের আয়োজন অনেকটাই কমে গেছে। দীর্ঘদিন পর এমন বড় পরিসরে নৌকা বাইচের আয়োজন হওয়ায় তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে প্রতিযোগিতা উপভোগ করতে এসেছেন। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মও গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
আয়োজক ও স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে এ ধরনের আয়োজন করা হলে বেলকুচির ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচের সংস্কৃতি আরও সমৃদ্ধ হবে। পাশাপাশি এ আয়োজন স্থানীয় মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।