সুঁই-সুতায় ২০০ নারী বুনছেন নিজের ভবিষ্যৎ

পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা

সারাদেশ

সুঁই-সুতার প্রতিটি ফোঁড়ে যেন লেখা হচ্ছে নতুন জীবনের গল্প। কারও হাতে ফুটে উঠছে ফুল, কারও কাপড়ে পাখি কিংবা লতাপাতার নকশা।

2026-09-06T15:34:24+00:00
2026-09-06T15:34:24+00:00
  রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২২ ভাদ্র ১৪৩৩
 
রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
সুঁই-সুতায় ২০০ নারী বুনছেন নিজের ভবিষ্যৎ
পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা
রোববার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৩:৩৪ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
সুঁই-সুতার প্রতিটি ফোঁড়ে যেন লেখা হচ্ছে নতুন জীবনের গল্প। কারও হাতে ফুটে উঠছে ফুল, কারও কাপড়ে পাখি কিংবা লতাপাতার নকশা। পাশেই খটখট শব্দে চলছে সেলাই মেশিন। সংসারের অভাব-অনটনের হিসাব কষতে অভ্যস্ত যে হাতগুলো, সেই হাতেই এখন তৈরি হচ্ছে আয়ের পথ।

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের প্রতাপ ছয়ঘরি এলাকায় গড়ে ওঠা ছোট্ট এক এমব্রয়ডারি পল্লী বদলে দিয়েছে প্রায় ২০০ নারীর জীবন। মা মোছা. লতিফা বেগম ও মেয়ে তাসলিমা আক্তার তানজিনার হাত ধরে গড়ে ওঠা এই উদ্যোগ এখন হয়ে উঠেছে গ্রামের নারীদের কর্মসংস্থানের অন্যতম ঠিকানা।

কেউ ঘরের কাজের ফাঁকে আয় করছেন, কেউ নিজের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন, আবার কেউ পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে বাড়াচ্ছেন নিজের অবদান। সুঁই-সুতার কাজ যেন তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছে আত্মনির্ভরতার নতুন চাবিকাঠি।

ছোট উদ্যোগেই শুরু

২০২২ সালে সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের প্রশিক্ষণ নেন লতিফা ও তাসলিমা। এরপর অর্ডারের ভিত্তিতে পোশাকে এমব্রয়ডারির কাজ শুরু করেন তাঁরা। প্রথম দিকে কাজের পরিমাণ ছিল খুবই কম। পরিচিতজন ও স্থানীয় ক্রেতাদের অর্ডারেই চলত কাজ।

তবে কাজের মান ভালো হওয়ায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে পরিচিতি ও অর্ডার। বাড়তে থাকে কাজের পরিধিও। কিন্তু নতুন করে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় মূলধনের সংকট।

কাপড়, সুতা, নকশার সরঞ্জাম ও অন্যান্য উপকরণ কেনার জন্য প্রয়োজন ছিল বাড়তি অর্থ। তখন তাঁদের পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) ক্ষুদ্র ঋণ। সেই অর্থ কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে ধীরে ধীরে বড় করতে থাকেন উদ্যোগ।

এরপর তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন আশপাশের নারীরা। একসময় মা-মেয়ের ছোট উদ্যোগটি রূপ নেয় নারীদের কর্মসংস্থানের একটি কেন্দ্রে।

সংসারের কাজের ফাঁকে নিজের আয়

বর্তমানে এই পল্লীতে শাড়ি, থ্রি-পিস, সালোয়ার-কামিজসহ বিভিন্ন পোশাকে এমব্রয়ডারি ও সেলাইয়ের কাজ হয়। কেউ কাপড় কাটেন, কেউ নকশা করেন, কেউ সেলাই করেন। আবার কেউ তৈরি পোশাকে দেন শেষ ছোঁয়া।

অর্ডার পাওয়া পোশাক শুধু স্থানীয় বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; বিভিন্ন জেলার ক্রেতাদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে এসব পণ্য।

এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন কলেজপড়ুয়া হাসি খাতুন ও আদুরি আক্তারও। পড়াশোনার পাশাপাশি তাসলিমার কাছ থেকে এমব্রয়ডারির কাজ শিখে এখন নিয়মিত কাজ করছেন তাঁরা। এতে মাসে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে তাঁদের।

হাসি-আদুরির মতো অনেক নারীর কাছেই এই আয় শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়; নিজের প্রয়োজন নিজে মেটানোর আত্মবিশ্বাসও।

লাভের পাশাপাশি বড় স্বপ্ন

লতিফা বেগম জানান, কারখানার সব খরচ বাদ দিয়ে মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা লাভ থাকে। তবে বর্তমান পরিসরে থেমে থাকতে চান না তিনি।

উৎপাদন বাড়াতে প্রয়োজন একটি শেড, এমব্রয়ডারি মেশিন, আধুনিক সরঞ্জাম ও পর্যাপ্ত কাঁচামাল। পাশাপাশি বড় অর্ডার নিতে হলে বাড়াতে হবে বিনিয়োগও।

লতিফার প্রয়োজন অন্তত ৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত মূলধন। সরকারি কিংবা বেসরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও নারীর কর্মসংস্থান করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।

মেয়ে তাসলিমা আক্তার তানজিনার স্বপ্ন আরও বড়। গ্রামের এই উদ্যোগকে ভবিষ্যতে একটি পরিচিত ব্র্যান্ডে রূপ দিতে চান তিনি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁদের তৈরি পোশাক পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি আরও বেশি নারীকে কাজের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

সহযোগিতার আশ্বাস

সাদুল্লাপুর উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. সালাউদ্দিন বলেন, গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এমব্রয়ডারি ও হস্তশিল্পের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। লতিফা ও তাঁর মেয়েকে ঋণসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। তাঁদের জন্য একটি শেড স্থাপনেরও চেষ্টা করা হবে।

প্রতাপ ছয়ঘরির এই এমব্রয়ডারি পল্লীতে তাই শুধু কাপড়ের ওপর নকশা আঁকা হয় না—সুঁই-সুতার প্রতিটি ফোঁড়ে তৈরি হচ্ছে সম্ভাবনার নতুন গল্প। মা-মেয়ের ছোট্ট একটি উদ্যোগ আজ প্রায় ২০০ নারীর হাতে তুলে দিয়েছে কাজের সুযোগ, আয়ের পথ আর আত্মনির্ভর হওয়ার সাহস।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: