হঠাৎ কালচে হয়ে গেছে নদীর পানি। ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। সেই পানিতে ভেসে উঠছে দেশীয় প্রজাতির ছোট-বড় অসংখ্য মরা মাছ। নদীতে নামলেই গায়ে দেখা দিচ্ছে চুলকানি। এমন ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে নাটোরের বারনই নদীর দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে।
নাটোরের নলডাঙ্গা থেকে রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পর্যন্ত প্রায় ৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর পানিতে এই পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রাত থেকেই নদীর পানি কালচে হতে শুরু করে। কোথাও কোথাও পানির মধ্যে গ্যাসের বুদবুদও দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার সকাল থেকে মাছ মরে ভেসে উঠতে শুরু করলে নদীর পাড়ে মানুষের ভিড় বাড়ে।
তবে মরা মাছ ভেসে উঠলেও অনেকে সেগুলো ধরে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে নদীর দূষিত পানি গায়ে লাগায় চুলকানি হওয়ায় আতঙ্কও তৈরি হয়েছে।
বারনই নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন নলডাঙ্গার বাশিলা গ্রামের জেলে ভবেশ চন্দ্র। তিনি বলেন, কয়েক দিন ধরে নদীতে নেমে মাছ ধরতে পারছেন না। পানিতে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ। গায়ে লাগলে চুলকানি হচ্ছে। মাছও মরে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়বে।
নলডাঙ্গা ব্রিজ ঘাটের নৌকার মাঝি হবিবর রহমান বলেন, সারাদিন নদীর পানিতেই নৌকা নিয়ে থাকতে হয়। কিন্তু দুই দিন ধরে পানিতে দুর্গন্ধ। সব মাছ মরে ভেসে উঠছে। এখন ভয়ে নদীর পানি মুখেও নিতে পারছেন না।
দূষিত বর্জ্যেই কি মরছে মাছ?
বারনই নদী আগেও দূষণের কবলে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন বর্জ্য ও রাসায়নিকমিশ্রিত পানি খাল-নালা হয়ে নদীতে গিয়ে পড়ছে। পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও চিনিকলের বর্জ্যও নদীর পানিতে মিশছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে নদীতে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার কারণে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হয়েছে। পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়াও মাছ মারা যাওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। এর আগে ২০২২ সালেও বারনই নদীতে একইভাবে মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল।
জীববৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করা নলডাঙ্গার তরুণ ফজলে বলেন, এর আগেও বারনই নদীর পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছিল এবং মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল। কিন্তু মাছ কেন মারা যাচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি। এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হলেও কারণ অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
বলছে মৎস্য বিভাগ
নলডাঙ্গা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, পাট পচানোর বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে দূষণ তৈরি করতে পারে। এতে অতিরিক্ত গ্যাস তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে মাছ মারা যেতে পারে। এ ছাড়া রাজশাহী নগরী ও বিভিন্ন শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্যও নদীর পানিকে দূষিত করতে পারে।
নাটোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ওমর আলী বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তাহেরপুর এলাকার পোলট্রি খামারের বর্জ্য, রাজশাহী সিটির বর্জ্য ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর পানিতে মিশে থাকতে পারে। এতে পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে মাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি জানান, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার মাধ্যমে নদীর পানি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হবে। তবে তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ওষুধ নেই এবং যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়ে আছে। আপাতত কয়েক দিন নদীর পানি ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে স্থানীয়দের সতর্ক করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সতর্ক করলেই হবে না—দ্রুত নদীর পানি ও মাছ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীতে বর্জ্য ও রাসায়নিক ফেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।