বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে গর্ভবতী একটি গাভীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। মাঠে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়ার পর নিখোঁজ হওয়া গাভীটির মরদেহ কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় একটি খাল থেকে উদ্ধারের ঘটনায় দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন মালিক।
মোরেলগঞ্জের বিশারীঘাটা গ্রামের বাসিন্দা মো. ছরোয়ার শেখ বাগেরহাটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন। মামলায় একই গ্রামের মোশাররফ হোসেন ও ইউনুচ মোল্লাকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি সিআর ৫৫১/২৬ নম্বরে দায়ের করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৭৯, ৪২৯ ও ৫০৬(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে মামলায় আনা অভিযোগ এখনো তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রমাণিত হয়নি। আসামিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
মামলার আরজিতে ছরোয়ার শেখ দাবি করেন, গত ৩ জুন সকালে প্রতিদিনের মতো তিনি তাঁর চারটি গরু মাঠে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দেন। এর মধ্যে একটি ছিল গর্ভবতী গাভী।
বাদীর অভিযোগ, গরুগুলো একপর্যায়ে আসামিদের বাড়ির খড়-কুটার গাদার কাছে চলে যায়। সেখানে গর্ভবতী গাভীটি খড় খেতে শুরু করে।
মামলার বিবরণে বলা হয়, সকাল ৮টার দিকে বাদীর মেয়ে সালমা বেগম ওই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি গরুকে ট্রাক্টরের হ্যান্ডেল দিয়ে মারধর করতে দেখেন। তবে তখন সেটি তাঁর বাবার গর্ভবতী গাভী ছিল কি না, তিনি বুঝতে পারেননি বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
দুপুরে মাঠে গিয়ে ছরোয়ার শেখ তিনটি গরু ফিরে পেলেও গর্ভবতী গাভীটির কোনো সন্ধান পাননি। পরে আশপাশে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন তিনি।
বিকেল ৩টার দিকে স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন, আসামিদের বাড়ির দক্ষিণ পাশে একটি খালে একটি গরুর মরদেহ ভাসছে। সেখানে গিয়ে তিনি মরদেহটি তাঁর নিখোঁজ গাভীর বলে শনাক্ত করেন বলে মামলার আরজিতে দাবি করেছেন।
বাদীপক্ষের আরও দাবি, স্থানীয় কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে খাল থেকে গাভীটির মরদেহ তোলার পর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়। মামলায় বলা হয়েছে, গাভীটি গর্ভবতী ছিল এবং মৃত্যুর পর তার বাচ্চা প্রসবের ঘটনাও ঘটে।
এ অবস্থায় বাদীর অভিযোগ, গাভীটিকে মারধর করে হত্যার পর মরদেহ খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে। গাভীটির আনুমানিক মূল্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গাভীটির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং শরীরে থাকা কথিত আঘাতের চিহ্নের কারণ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
মামলার আরজিতে বাদীপক্ষ দাবি করেছে, ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে সালিশ-বৈঠক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দপ্তরেও বৈঠক হয়।
বাদীর দাবি, সালিশে গরু মারা যাওয়ার ঘটনায় আসামিদের ৮০ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁরা ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেননি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাদীকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও মামলায় করা হয়েছে। এ কারণে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করেছেন।
ছরোয়ার শেখের দাবি, ঘটনার পর তিনি মোরেলগঞ্জ থানায় মামলা করতে গেলে তা গ্রহণ করা হয়নি। পরে বাধ্য হয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।
মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, থানায় মামলা না হওয়ায় আদালতে মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। পরে ২৭ আগস্ট বাগেরহাটের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মামলার আসামি মোশাররফ হোসেন ও ইউনুচ মোল্লার সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মামলার আরজিতে আসামিদের বিরুদ্ধে পূর্বেও গরু মারধরসহ বিভিন্ন অভিযোগ থাকার দাবি করা হয়েছে। কয়েকটি ঘটনায় জরিমানার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গর্ভবতী গাভীটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, কীভাবে কয়েক ঘণ্টা পর খালে তার মরদেহ পাওয়া গেল, শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না এবং মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং প্রয়োজন হলে গাভীটির মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ মতামত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গাভীর মালিকের করা মামলার অভিযোগের ভিত্তিতে এখন বিষয়টি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা এবং আসামিদের দায় শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে।