প্রবাসীকে চড় মারার অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসের সেবা নিয়ে একের পর এক অভিযোগ সামনে এসেছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নাম ও তথ্য সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, দিনের পর দিন অফিসে ঘোরানো এবং দালালের মাধ্যমে টাকা চাওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী।
সম্প্রতি এনআইডির সমস্যা সমাধানের জন্য সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে গিয়ে কর্মকর্তার হাতে চড় খাওয়ার অভিযোগ করেন পর্তুগালপ্রবাসী জকিগঞ্জের এক নাগরিক। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ঘটনাটিকে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে দাবি করেছেন।
এর মধ্যেই একই অফিসের সেবা নিয়ে আরও কয়েকজন নাগরিকের অভিযোগ সামনে এসেছে। তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও সংশোধনের কাজ শেষ না করে নানা অজুহাতে বারবার অফিসে আসতে বলা হচ্ছে।
কাগজপত্র দিয়েও শেষ হচ্ছে না ভোগান্তি
নাম সংশোধনের জন্য নির্বাচন অফিসে আবেদন করা সেবাপ্রত্যাশী কামরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আবেদন করার পর তাকে একের পর এক নতুন কাগজপত্র জমা দিতে বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন কাগজ নিয়ে আসতে বলে দীর্ঘদিন ধরে তাকে ঘোরানো হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকরা লেখালেখি করলেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে দাবি তার।
কামরুলের অভিযোগ, সরকারি একটি নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে এভাবে দিনের পর দিন ঘোরানো হলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়।
এনআইডিতে ‘স্বপ্নদোষ’, সংশোধনে ঘুরছেন স্বপ্না
নামের ভুল সংশোধনের জন্য নির্বাচন অফিসে ঘুরছেন আরেক সেবাপ্রত্যাশী স্বপ্না বেগম। তার দাবি, এনআইডিতে তার নাম ‘স্বপ্না বেগম’-এর পরিবর্তে ভুলভাবে ‘স্বপ্নদোষ’ লেখা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিচয়পত্রে এমন ভুল থাকায় দ্রুত সংশোধনের প্রয়োজন হলেও আবেদন নিয়ে তাকে বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্বপ্না বেগমের আরও অভিযোগ, সেবা দ্রুত করে দেওয়ার কথা বলে দালালরা তার কাছে টাকা চেয়েছে।
তিনি বলেন, দালালরা বলছে কিছু টাকা দিলে কাজ হয়ে যাবে।
তবে দালালের টাকা চাওয়ার এই অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দালাল কিংবা নির্বাচন অফিস কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
দালালচক্রের অভিযোগ কতটা সত্য?
নির্বাচন অফিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নাগরিক সেবা প্রতিষ্ঠানে দালালের মাধ্যমে টাকা নিয়ে কাজ করে দেওয়ার অভিযোগ গুরুতর। অভিযোগটি সত্য হলে দালালদের সঙ্গে অফিসের কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না, কিংবা তারা কীভাবে সেবাপ্রত্যাশীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে—তা তদন্তের দাবি রাখে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, এনআইডি সংশোধনের আবেদন নিষ্পত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমা কতটুকু মানা হচ্ছে এবং আবেদনকারীদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা শুরুতেই স্পষ্টভাবে জানানো হচ্ছে কি না।
এক ঘটনার পর সামনে একাধিক অভিযোগ
প্রবাসীকে চড় মারার অভিযোগকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ‘ভুল বোঝাবুঝি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করলেও একই অফিসের সেবা নিয়ে পরপর একাধিক নাগরিকের অভিযোগ নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে সেবা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠছে। বিশেষ করে প্রবাসীকে চড় মারার অভিযোগের সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের আবেদন ও নথিপত্র এবং দালালদের টাকা চাওয়ার অভিযোগ খতিয়ে দেখলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
জবাবদিহি নিশ্চিত হবে কীভাবে?
একজন সাধারণ নাগরিক কিংবা প্রবাসী—সবার জন্য সরকারি নাগরিক সেবা পাওয়ার অধিকার সমান। তাই হয়রানি, দুর্ব্যবহার কিংবা দালালের মাধ্যমে টাকা চাওয়ার অভিযোগ উঠলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায় নির্ধারণ জরুরি।
তবে অভিযোগ উঠলেই তা সত্য ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাইয়ের পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
সিলেট আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে সেবাপ্রত্যাশীদের অভিযোগের পেছনে বাস্তবতা কতটা, আর কোথায় সেবাব্যবস্থার ঘাটতি—তা নিরপেক্ষ তদন্তেই স্পষ্ট হতে পারে।