আফ্রিকার আজব দুনিয়া—অবাক করা সংস্কৃতি

অনলাইন ডেস্ক

বিবিধ

বিশাল আয়তনের আফ্রিকা মহাদেশে রয়েছে অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতি। তাদের জীবনযাপন, সামাজিক রীতি, পোশাক, উৎসব, নাচ-গান ও বিশ্বাসে রয়েছে বৈচিত্র্য।

2026-09-03T20:18:16+00:00
2026-09-03T20:18:50+00:00
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবিধ
আফ্রিকার আজব দুনিয়া—অবাক করা সংস্কৃতি
অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:১৮ পিএম  আপডেট: ০৩.০৯.২০২৬ ৮:১৮ পিএম
সংগৃহীত ছবি
বিশাল আয়তনের আফ্রিকা মহাদেশে রয়েছে অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী ও উপজাতি। তাদের জীবনযাপন, সামাজিক রীতি, পোশাক, উৎসব, নাচ-গান ও বিশ্বাসে রয়েছে বৈচিত্র্য। এমন কিছু ঐতিহ্যও আছে, যা অন্য সংস্কৃতির মানুষের কাছে বেশ বিস্ময়কর কিংবা রহস্যময় মনে হতে পারে।

দেশ, কাল ও সংস্কৃতি ভেদে মানুষের রীতি-নীতি ও সামাজিক আচরণে পার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও রয়েছে এমনই নানা বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য। চলুন জেনে নেওয়া যাক আফ্রিকার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক রীতি সম্পর্কে।

ভুঁড়িই যখন গর্বের বিষয়

বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যেখানে ওজন কমাতে জিমে ছুটছেন, ডায়েট করছেন কিংবা যোগব্যায়ামে ঘাম ঝরাচ্ছেন, সেখানে আফ্রিকার একটি জনগোষ্ঠীর চিত্র একেবারেই উল্টো। সেখানে শরীরে যত বেশি মেদ, তত বেশি সম্মান! এমনকি বড় ভুঁড়িই পুরুষদের কাছে সৌন্দর্য ও গৌরবের প্রতীক। 

ইথিওপিয়ার ওমো উপত্যকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী বদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী এক প্রতিযোগিতা। লক্ষ্য একটাই—কে হতে পারবেন সবচেয়ে মোটা পুরুষ? বদি জনগোষ্ঠীর তরুণদের কাছে এই প্রতিযোগিতা শুধু শরীরের আকার বাড়ানোর লড়াই নয়; এটি সামাজিক মর্যাদা অর্জনেরও একটি সুযোগ। প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে গ্রামের মানুষের কাছে তিনি ‘নায়ক’ হিসেবে বিশেষ সম্মান পান।

প্রতি বছর নববর্ষ উপলক্ষে বদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় ‘কায়েল’ উৎসব। এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই আয়োজন করা হয় মোটা হওয়ার প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতার প্রায় ছয় মাস আগে বাছাই করা হয় কয়েকজন অবিবাহিত যুবককে। এরপর তারা অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেন। এই সময়ে তাঁদের দেওয়া হয় বিশেষ খাবার ও পানীয়, যার উদ্দেশ্য দ্রুত ওজন বাড়ানো। ছয় মাস ধরে শরীরে মেদ জমিয়ে প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হন তাঁরা। এরপর কায়েল উৎসবের দিনে নিজেদের পরিবর্তিত শরীর নিয়ে হাজির হন প্রতিযোগীরা। 

প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া তরুণদের শরীরের আকার ও ওজনই হয়ে ওঠে মূল আলোচনার বিষয়। কে কতটা ওজন বাড়াতে পেরেছেন, কার ভুঁড়ি সবচেয়ে বড়—এসবের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় বিজয়ী। সবচেয়ে মোটা পুরুষের শিরোপা যিনি পান, তাঁর জন্য অপেক্ষা করে বিশেষ সামাজিক মর্যাদা। বিজয়ীকে দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের একজন সম্মানিত ব্যক্তি বা ‘হিরো’ হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের প্রচলিত সৌন্দর্যের ধারণার সঙ্গে এই সংস্কৃতির পার্থক্যই সবচেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করে। যেখানে অতিরিক্ত ওজনকে অনেক সমাজে স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়, সেখানে বদি জনগোষ্ঠীর এই ঐতিহ্যে বড় শরীরই হয়ে উঠেছে গর্ব ও মর্যাদার প্রতীক।

ভিন্নধাঁচের হাত মেলানো

ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে অভিবাদনের ধরন হিসেবে চুম্বন প্রচলিত থাকলেও আফ্রিকার অনেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে করমর্দনই স্বাগত জানানোর অন্যতম প্রচলিত রীতি। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই করমর্দনের ধরন গতানুগতিক নয়। হাতের মুঠো, আঙুল ও হাতের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হয় ভিন্নধাঁচের অভিবাদন।

জোরে কথা বলাও এক ধরনের সামাজিক রীতি

আফ্রিকার কিছু সংস্কৃতিতে তুলনামূলক উচ্চস্বরে কথা বলা অস্বাভাবিক নয়। এর পেছনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও রয়েছে। অনেকের ধারণা, সবার সামনে স্বাভাবিকভাবে কথা বললে গোপন আলোচনা বা কাউকে আড়ালে নিয়ে কথা বলার সন্দেহ তৈরি হয় না। ফলে উচ্চস্বরে কথা বলাকে কখনো কখনো স্বচ্ছতা ও সামাজিক সম্পৃক্ততার অংশ হিসেবেও দেখা হয়।

জীবনের নানা আয়োজনে নাচ

আফ্রিকার বহু জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির সঙ্গে নাচ ও সংগীত গভীরভাবে জড়িত। বিয়ে, উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান এমনকি কোনো কোনো জনগোষ্ঠীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতেও নাচের আয়োজন দেখা যায়। অনুষ্ঠান ও উপলক্ষ অনুযায়ী নাচের ধরন, পোশাক ও সংগীতেও থাকে ভিন্নতা।

মাছাইদের ঐতিহ্যবাহী লাফের নাচ

কেনিয়া ও তানজানিয়ায় বসবাসকারী মাছাই জনগোষ্ঠীর একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী লাফের নাচ। প্রাপ্তবয়স্ক বা যোদ্ধা হওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন আয়োজনে এই নাচের প্রচলন রয়েছে।

নাচের সময় তরুণরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে লাফ দেন। কে কতটা উঁচুতে লাফ দিতে পারেন, সেটিও সেখানে শারীরিক সক্ষমতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। মাছাইদের ঐতিহ্যবাহী সংগীতে কণ্ঠের ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

চিউয়া জনগোষ্ঠীর গুলে ওয়ামকুলু

মালাউই, জাম্বিয়া ও মোজাম্বিক অঞ্চলের চিউয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘গুলে ওয়ামকুলু’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নৃত্য। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এটি পরিবেশিত হয়।

এই নাচে অংশগ্রহণকারীরা বিশেষ পোশাক ও মুখোশ ব্যবহার করেন। নৃত্যের মাধ্যমে তারা নিজেদের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরেন। চিউয়া সংস্কৃতিতে পূর্বপুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গেও এই নৃত্যের যোগ রয়েছে।

লোবলা: বিয়ের একটি পুরোনো প্রথা

দক্ষিণ আফ্রিকার জুলুসহ কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘লোবলা’ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী বিয়ের রীতি রয়েছে। এতে বর বা বরের পরিবার কনের পরিবারকে উপহার বা সম্পদ প্রদান করে। ঐতিহাসিকভাবে গবাদিপশু লোবলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

বিয়ের আগে দুই পরিবারের মধ্যে আলোচনা করে এর পরিমাণ বা ধরন নির্ধারণ করা হয়। বিভিন্ন সমাজে এই প্রথার নিয়ম ও গুরুত্বে অবশ্য পার্থক্য রয়েছে।

সাপের শরীর, মাছের মাথা—নিয়ামি নিয়ামি

আফ্রিকার সবচেয়ে রহস্যময় সাংস্কৃতিক বিশ্বাসগুলোর একটি হলো জাম্বেজি নদীকে ঘিরে টঙ্গা জনগোষ্ঠীর ‘নিয়ামি নিয়ামি’ বিশ্বাস।

লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নিয়ামি নিয়ামি হলো নদীর এক অতিপ্রাকৃত রক্ষক। এর অবয়ব কল্পনা করা হয় সাপের শরীর ও মাছের মাথার সমন্বয়ে। কারিবা বাঁধ নির্মাণের সময় নদী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনকে ঘিরে নিয়ামি নিয়ামিকে কেন্দ্র করে নানা কিংবদন্তি আরও ছড়িয়ে পড়ে।

ভিক্টোরিয়া জলপ্রপাত অঞ্চলেও নিয়ামি নিয়ামিকে ঘিরে স্মৃতিচিহ্ন ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপনা দেখা যায়।

হিম্বা নারীদের শরীরে লাল মাটি

নামিবিয়ার কুনেনে অঞ্চলের হিম্বা জনগোষ্ঠীর নারীদের বিশেষ ধরনের সাজসজ্জা বেশ পরিচিত। তারা ‘ওটজিজে’ নামে পরিচিত লালচে মাটি ও চর্বিজাতীয় উপাদানের মিশ্রণ শরীর ও চুলে ব্যবহার করেন।

এই লাল মাটির ব্যবহার শুধু সৌন্দর্যচর্চার অংশ নয়; এটি তাদের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত। শুষ্ক ও রৌদ্রপ্রধান পরিবেশে এই মিশ্রণ ত্বককে সূর্যের তীব্রতা ও ধুলাবালি থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়।

পরিবার ও পূর্বপুরুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা

আফ্রিকার অনেক জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামোয় পরিবারের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পরিবার বলতে শুধু বাবা-মা, সন্তান বা স্বামী-স্ত্রীকে বোঝানো হয় না; চাচা-চাচি, মামা-মামী, খালা-খালু এবং অন্যান্য আত্মীয়ও বৃহত্তর পরিবারের অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন।

বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতিও অনেক আফ্রিকান সমাজে বিশেষ সম্মান দেখানো হয়। তাদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শকে সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়ার ঐতিহ্য রয়েছে।

পূর্বপুরুষদের ঘিরে বিশ্বাস

সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোথাও কোথাও পূর্বপুরুষদের আত্মিক শক্তির ওপর বিশ্বাস রয়েছে। তাদের স্মরণে নাচ, গান, আচার-অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন সামাজিক আয়োজন করা হয়।

এসব রীতি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের বিষয় নয়; অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো একটি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, পরিচয় ও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।

আফ্রিকার সংস্কৃতি তাই একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। মহাদেশটির প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস, বিশ্বাস ও জীবনধারা। আর সেই বৈচিত্র্যই আফ্রিকাকে বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছে।

সূত্র: আফ্রিকান বাজেটস অ্যাফেয়ার্স


Loading...
Loading...

বিবিধ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: