
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসেও গুমের অভিযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদনে এসব ঘটনার সংখ্যা কয়েক শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নিখোঁজ ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন গোপন স্থানে আটকে রাখার অভিযোগও করেছেন স্বজনরা। এসব গোপন স্থানের কয়েকটিকে পরবর্তী সময়ে ‘আয়নাঘর’ নামে উল্লেখ করা হয়।
গুমের অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এ ধরনের অভিযোগের নানা দিক উঠে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত, ভুক্তভোগীদের অবস্থান শনাক্ত এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি আরও জোরালো হয়। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও বিভিন্ন অভিযোগ ও আবেদন করা হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুমের ঘটনাকে শুধু একজন ব্যক্তির নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে এর সঙ্গে একটি পরিবারের ওপর নেমে আসা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিকটি তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে গুমের অভিযোগগুলো তদন্ত করে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গুম প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অবস্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ জোরপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করে। এর পর দেশে এ অপরাধ প্রতিরোধ ও ভুক্তভোগীদের প্রতিকারের সুযোগ তৈরিতে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি দায়ীদের শাস্তি, ভুক্তভোগীদের অধিকার রক্ষা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল-২০২৬’ গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালনের পেছনে জাতিসংঘের একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া রয়েছে। ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ জোরপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরবর্তী সময়ে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে সনদটি কার্যকর হয়। এরপর ৩০ আগস্ট দিনটি আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই এ দিবসের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের দীর্ঘ অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার বিষয়টিও দিবসটির মাধ্যমে সামনে আসে।
বাংলাদেশে গুমের অভিযোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছে। তাঁদের প্রত্যাশা, গুমের প্রতিটি অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা সামনে আসবে এবং ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার ন্যায়বিচার পাবে।