৯২ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একজনও এমবিবিএস ডাক্তার নেই!

চাঁদপুর সংবাদদাতা

সারাদেশ

চাঁদপুরের ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক পদে নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন না কোনো

2026-08-30T20:36:48+00:00
2026-08-30T20:36:48+00:00
  সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬,
১৬ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
সারাদেশ
৯২ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, একজনও এমবিবিএস ডাক্তার নেই!
চাঁদপুর সংবাদদাতা
রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৮:৩৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
চাঁদপুরের ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক পদে নিয়োগ থাকলেও বাস্তবে নিয়মিত সেবা দিচ্ছেন না কোনো এমবিবিএস চিকিৎসক। সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে (এটাচমেন্ট) থাকায় ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব কেন্দ্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এর সঙ্গে রয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট ও প্রয়োজনীয় ওষুধের অপ্রতুলতা। ফলে তৃণমূলের মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

চাঁদপুর জেলায় ইউনিয়ন পর্যায়ে মোট ৯২টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ২০টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং ৭২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এসব কেন্দ্রে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসা, মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এবং ওষুধের অপ্রতুলতায় কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসক পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের বড় একটি অংশকে সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে।

ফলে কাগজে-কলমে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলার ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনোটিতেই নিয়মিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা মিলছে না।

এ কারণে সামান্য অসুস্থতার জন্যও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা জেলা সদরে ছুটতে হচ্ছে। এতে একদিকে বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি, অন্যদিকে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক থাকলে জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া, সংক্রমণসহ সাধারণ রোগের চিকিৎসা স্থানীয়ভাবেই পাওয়া সম্ভব হতো। কিন্তু চিকিৎসক না থাকায় অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রই এখন অনেকটা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

শুধু চিকিৎসক নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরও বড় ধরনের সংকট রয়েছে।

উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ৫৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। শূন্য রয়েছে ৩৯টি পদ।

পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকার ১৪২টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫৯ জন। শূন্য রয়েছে ৮৩টি পদ।

পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শকের ৯১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৮২ জন। এ পদে শূন্য রয়েছে ৯টি।

এ ছাড়া পরিবার কল্যাণ সহকারীর ৫১৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৩৭ জন। শূন্য রয়েছে ১৭৬টি পদ।

ফলে চিকিৎসকের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতিও ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে দুর্বল করে তুলেছে।

জনবল সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ওষুধের অপ্রতুলতা। ইউনিয়ন পর্যায়ের এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় তা মিলছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পরও বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে হচ্ছে রোগীদের। এতে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসে বাড়তি খরচের মুখে পড়ছেন নিম্নআয়ের মানুষ।

তাদের ভাষ্য, চিকিৎসক, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও ওষুধ নিশ্চিত করা গেলে ছোটখাটো অসুস্থতার জন্য উপজেলা বা জেলা সদরে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসত।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. শাহাদাত হোসাইন বলেন, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র এবং উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে রাখা হয়েছে। এ কারণে তারা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত সময় দিতে পারছেন না।

তিনি বলেন, সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে যথাযথ সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হলে ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

চাঁদপুর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মো. মোস্তফা কামাল বলেন, জনবল সংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর জনবল সংকট অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ওষুধ সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে কিছুটা সংকট রয়েছে। তবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে সাধারণ মানুষ আরও ভালোভাবে প্রয়োজনীয় সেবা ও ওষুধ পাবেন।

স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো ইউনিয়ন পর্যায়ের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের জন্য উপজেলা বা জেলা হাসপাতালের তুলনায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রই সবচেয়ে সহজলভ্য হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকরাই যদি অন্য প্রতিষ্ঠানে সংযুক্তিতে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে এসব কেন্দ্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র কার্যকর করতে শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই হবে না; নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিজ নিজ কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীর শূন্য পদ পূরণ এবং পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

চাঁদপুরের ৯২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়মিত চিকিৎসক, পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা না গেলে তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দ্রুত চিকিৎসকদের সংযুক্তি প্রত্যাহার করে নিজ নিজ কর্মস্থলে পদায়ন, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: