প্রতিদিনের মতো রবিবারও স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। প্রিয় শিক্ষককে ঘিরে ক্লাস, পড়াশোনা আর নানা গল্পে কাটবে দিন, এমনটাই ছিল ছোট্ট শিশুদের প্রত্যাশা। কিন্তু স্কুলে গিয়ে তারা পেল এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
স্কুলের মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল লাশবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্স। ভেতরে নিথর হয়ে শুয়ে আছেন তাদের প্রিয় ‘রনজিলা ম্যাডাম’।
কাচের ফাঁক দিয়ে শেষবারের মতো শিক্ষকের মুখ দেখছিল ছোট ছোট শিশুরা। কেউ নীরবে কাঁদছিল, কেউ চোখ মুছছিল হাতের জামায়। প্রিয় শিক্ষক আর কোনোদিন ক্লাসে এসে তাদের আদর করবেন না, কাছে ডেকে কথা বলবেন না—এই বাস্তবতা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না তারা।
শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, রনজিলা পারভীনের সহকর্মী, অভিভাবক ও সাবেক শিক্ষার্থীদের চোখেও ছিল অশ্রু। স্কুলজীবনের নানা স্মৃতি মনে করে সবাই শোক প্রকাশ করছিলেন।
প্রায় চার দশক কেটেছে স্কুলেই
বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের সঙ্গে রনজিলা পারভীনের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে পদোন্নতি পেয়ে একই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিশুকে পড়িয়েছেন রনজিলা। শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তার ছিল আন্তরিক সম্পর্ক। তাদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, ছিলেন অভিভাবকের মতোই আপনজন।
চোখের চিকিৎসার জন্য শনিবার ভোরে স্বামী আব্দুল মতিনের সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিলেন ৫৭ বছর বয়সী রনজিলা পারভীন।
হাসপাতালে যাওয়ার পথে সংসদ ভবন এলাকায় রিকশায় থাকা অবস্থায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি। অভিযোগ, মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি তার হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দিলে রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান রনজিলা।
পরে তাকে দ্রুত শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চোখের চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে স্বামীর সঙ্গে বাড়ি ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু তার বদলে ফিরল নিথর দেহ।
ঢাকায় ময়নাতদন্ত শেষে শনিবার গভীর রাত ২টার দিকে রনজিলা পারভীনের মরদেহ বগুড়ায় পৌঁছায়।
রোববার দুপুর ২টার দিকে বাগবাড়ী সরকারি বালিকা বিদ্যালয় মাঠে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্বজন ও স্থানীয়রা অংশ নেন।
জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই তাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য ছুটে আসেন। আর প্রিয় শিক্ষককে শেষ বিদায় জানাতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা।
প্রথম জানাজা শেষে রনজিলা পারভীনের মরদেহ নেওয়া হয় গাবতলীর দাড়াইল গ্রামে তার স্বামীর বাড়িতে। সেখানে পারিবারিক গোরস্তানে বিকাল সোয়া ৩টার দিকে তাকে দাফন করা হয় বলে জানান তার বড় ভাই জাহিদুল ইসলাম।
রনজিলা পারভীনের স্বামী আব্দুল মতিন বগুড়া নিউ মার্কেটের কাপড় ব্যবসায়ী। তাদের একমাত্র মেয়ে রাইশা বগুড়া ইয়াকুবিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে যেসব শিশুকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন রনজিলা, সেই শিশুরাই শেষবারের মতো অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানাল তাদের প্রিয় ‘ম্যাডামকে’।