তিন মাসের নীরবতায় প্রাণ ফিরেছে সুন্দরবনে
বাঘ-হরিণের অবাধ বিচরণ, খাল-বিলে বেড়েছে মাছ; ১ সেপ্টেম্বর খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার
মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট) প্রতিনিধি
রোববার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬, ৫:৩৯ পিএম আপডেট: ৩০.০৮.২০২৬ ৫:৫০ পিএম
ফাইল ছবিবিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে টানা তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় মানুষের পদচারণা কম থাকায় প্রাণ-প্রকৃতিতে ফিরেছে স্বস্তি। বনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘ-হরিণসহ বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ দেখা গেছে। একই সঙ্গে নদী-খালে বেড়েছে মাছের উপস্থিতি। সবুজে সতেজ হয়ে উঠেছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা।
তবে তিন মাসের এই নীরবতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে সুন্দরবনে প্রবেশের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হচ্ছে। ফলে আবারও বনে ফিরবেন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকরা। নদী-খালে নামবে মাছ ধরার নৌকা, শুরু হবে মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন কার্যক্রম।
সুন্দরবন শুধু বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলই নয়, এটি উপকূলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন। একই সঙ্গে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর, লাল কাঁকড়াসহ অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল।
মানুষের অনুপস্থিতিতে স্বস্তিতে বন্যপ্রাণী : সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণের জন্য শান্ত ও নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের চলাচল, নৌযানের শব্দ, মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং বনজ সম্পদ সংগ্রহের চাপ কমে গেলে প্রাণীরা তুলনামূলক নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে পারে।
এবারের তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার রয়েল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি দেখা গেছে। কখনো খালের পাড়ে, কখনো বনের ভেতরে বাঘের চলাচলের চিহ্ন ও উপস্থিতি নজরে এসেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় হরিণের পাল, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়ার বিচরণও দেখা গেছে। খালের পানিতে ও নদীর তীরে কুমিরের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
বন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানুষের চাপ কম থাকায় এ সময়ে বন্যপ্রাণীরা তুলনামূলক নির্বিঘ্নে বিচরণ ও প্রজননের সুযোগ পেয়েছে।
প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তিন মাস: জুন, জুলাই ও আগস্ট সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সময়। বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর প্রজনন সুরক্ষা, বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষায় এ সময়ে সুন্দরবনে প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখা হয়।
বন সংশ্লিষ্টদের মতে, মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় এ সময়ে বিভিন্ন প্রাণী নির্বিঘ্নে বিচরণ ও প্রজনন করতে পারে। একই সঙ্গে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর প্রজননের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
খাল-বিলে মাছের প্রাচুর্য: সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে নদী ও খালের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তিন মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বিভিন্ন নদী-খালে আহরণের চাপ কমেছে। ফলে মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ থাকায় সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ওপরও মানুষের চাপ কমেছে। এতে বনের প্রাকৃতিক পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া কিছুটা ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করছেন বন সংশ্লিষ্টরা।
নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি বাড়ানো হয় টহল: মানুষের প্রবেশ বন্ধ থাকলেও সুন্দরবনে বন অপরাধ, অবৈধ শিকার কিংবা অবৈধভাবে মাছ ধরার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়জুড়ে বন বিভাগ নজরদারি ও টহল জোরদার করে।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল। এ সময়ে বন অপরাধ কমেছে। বিভিন্ন খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে এবং হরিণের পালসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণও বেশি দেখা গেছে। এমনকি খালের পাড়ে বাঘের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে মাসে সাত দিন স্মার্ট পেট্রোলিং করা হলেও তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সময়ে তা বাড়িয়ে ২০ দিন করা হয়।
আবার বনে ফিরবেন জেলে-মৌয়াল: টানা তিন মাস সুন্দরবনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় বননির্ভর জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিদের আয়-রোজগারও বন্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় তারা এখন নতুন করে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নৌকা-জাল মেরামত, ইঞ্জিন পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি শেষ করেছেন অনেক জেলে। দীর্ঘদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার নদী-খালে ভালো মাছ পাওয়ার আশায় রয়েছেন তারা।
শরণখোলার জেলে আলাল মোড়ল বলেন, তিন মাস বনে যেতে পারেননি। নৌকা ও জাল মেরামত করে প্রস্তুত রেখেছেন। এতদিন মাছ ধরা বন্ধ থাকায় এবার বনে গেলে ভালো মাছ পাওয়ার আশা করছেন। মাছ ভালো পাওয়া গেলে বননির্ভর পরিবারগুলোর কষ্ট কিছুটা কমবে।
মধুর আশায় মৌয়ালরা: সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল আরেকটি বড় জনগোষ্ঠী মৌয়াল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মধু সংগ্রহ তাদের জীবন-জীবিকার অন্যতম উৎস।
শরণখোলার মৌয়াল জীবন কর্মকার বলেন, তিন মাস বনে যেতে না পারায় তাদের মতো বনজীবী মানুষের সংসারে টানাপোড়েন গেছে। সুন্দরবনই তাদের জীবিকার বড় ভরসা। নিষেধাজ্ঞা শেষে আবার বনে গিয়ে মধু ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে পারবেন—এতে তারা আশাবাদী।
তবে বন থেকে সম্পদ সংগ্রহের সময় বনের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ না করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে জীবিকা: বন বিভাগের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিপুলসংখ্যক বনজীবী সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধুসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণ করেন। পাশাপাশি সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে রয়েছে একাধিক পর্যটনকেন্দ্র। প্রতিবছর এসব পর্যটনকেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক পর্যটক ভ্রমণে আসেন।
ফলে সুন্দরবনকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বড় একটি অর্থনৈতিক বলয়। জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালি থেকে শুরু করে নৌকার মাঝি, ট্রলার মালিক, পর্যটন ব্যবসায়ী, গাইড, স্থানীয় দোকানি ও পরিবহনকর্মী—অনেকের জীবন-জীবিকা এই বনের সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত।
১ সেপ্টেম্বরের পর বড় পরীক্ষা: তিন মাসের নিষেধাজ্ঞায় সুন্দরবন যেমন স্বস্তি পেয়েছে, তেমনি সাময়িকভাবে আয়-রোজগার বন্ধ ছিল বননির্ভর মানুষের। এখন ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবার শুরু হবে মানুষের প্রবেশ।
ফিরবে মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ ও পর্যটন কার্যক্রম। মানুষের এই প্রত্যাবর্তন প্রয়োজনীয় হলেও সেটি যেন বনের ওপর নতুন চাপ তৈরি না করে, সেটিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বিচারে মাছ আহরণ, ছোট মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী শিকার, অতিরিক্ত বনজ সম্পদ আহরণ কিংবা নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ ঠেকাতে বন বিভাগের নজরদারি আরও জোরদার করার পাশাপাশি বনজীবীদেরও নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে।
তিন মাসের নীরবতা সুন্দরবনকে যেন একটি বার্তাই দিয়েছে—প্রকৃতিকে একটু সময় ও সুযোগ দিলে প্রকৃতি নিজেই অনেকটা পুনরুদ্ধার করতে পারে।
১ সেপ্টেম্বর আবার খুলবে সুন্দরবনের দুয়ার। কর্মচঞ্চল হবে নদী-খাল, বনে ফিরবেন জেলে-মৌয়াল-বাওয়ালিরা, পর্যটনকেন্দ্রগুলোও মুখর হবে মানুষের পদচারণায়। তবে এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যদি দায়িত্ববোধ, নিয়ম মেনে সম্পদ আহরণ এবং জীববৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা থাকে, তবেই তিন মাসের নিষেধাজ্ঞার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।
কারণ সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল, লাখো মানুষের জীবিকার ঠিকানা, অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আবাস এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে বাঘ-হরিণ, নদী-খাল, মাছ-কাঁকড়া ও জীববৈচিত্র্য। আর সুন্দরবন বাঁচলে বাঁচবে সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকাও।