খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় খাদ্যশস্য বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন, আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেকারত্ব দূরীকরণ ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে ২০টি প্রকল্পের বিপরীতে মোট ৩৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃত উপকারভোগীরা পুরো খাদ্যশস্য পেয়েছেন কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন।
নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, বরাদ্দকৃত চালের পরিবর্তে কোথাও নগদ অর্থ, কোথাও গরু, আবার কোথাও হাঁস-মুরগি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর না পাওয়া এবং কিছু প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতার কারণে বরাদ্দের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ ৩৫০ মেট্রিক টন চাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সফিকুর রহমান স্বাক্ষরিত স্মারক নং-২৯.০০.০০০০.০০০.২২৩.২০.০১৮.২৫-২৯৮, তারিখ ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এর প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুকূলে মোট ৩৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
নথি অনুযায়ী, ২০ জন উদ্যোক্তার নামে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বরাদ্দের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ১৬ জনের নামে মোট ২৮৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে মহালছড়ির বাবুপাড়া-থলিপাড়া এলাকার ১১ জনের নামেই বরাদ্দ রয়েছে ২০৫ মেট্রিক টন। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৯ শতাংশ চালই ওই এলাকার ১১ জনের নামে বরাদ্দ হয়েছে।
অন্যদিকে খাগড়াছড়ি জেলার অন্যান্য এলাকার চারজনের নামে বরাদ্দ রয়েছে ৬৫ মেট্রিক টন। বরাদ্দের এই কেন্দ্রীভবন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়ার অভিযোগ
বরাদ্দের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, সরকারি নথিতে চাল বরাদ্দ থাকলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দাবি করেছেন, তাঁরা চাল হাতে পাননি।
মহালছড়ির বাবুপাড়া এলাকার সুহাস রঞ্জন চাকমার নামে মিশ্র ফলজ বাগান সৃজন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রয়েছে। তাঁর দাবি, বরাদ্দকৃত চালের পরিবর্তে তাঁকে নগদ অর্থ দেওয়া হয়েছে।
সুহাস রঞ্জন চাকমা জানান, বাজারমূল্যের তুলনায় তিনি কম অর্থ পেয়েছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ে টাকা কর্তনের অভিযোগও করেন তিনি।
কারা টাকা কর্তন করেছেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি নাম প্রকাশে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষ্য, তাঁরা ‘ছোট মানুষ’; নাম প্রকাশ করলে সমস্যায় পড়তে পারেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
২০ মেট্রিক টন চালের বিপরীতে দুটি ছোট গরু
উগ্য মারমার নামে মৎস্য চাষ প্রকল্পের বিপরীতে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ না দিয়ে দুটি ছোট গরু দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, ২০ মেট্রিক টন চালের সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে গরু দুটির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং নির্ধারিত মূল্যের সঙ্গে বরাদ্দকৃত চালের সরকারি বা বাজারমূল্যের সামঞ্জস্য ছিল কি না।
এ বিষয়ে সরকারি নথি, মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
হাঁস-মুরগি দিয়েও বরাদ্দ সমন্বয়ের অভিযোগ
উজ্জয়িনী মারমার নামে ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন প্রকল্পে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনিও বরাদ্দকৃত চাল পাননি। এর পরিবর্তে তাঁকে কিছু হাঁস-মুরগি দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ওই হাঁস-মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন বলেও জানা গেছে।
এখানে প্রশ্ন হলো, সরকারি নথিতে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও উপকারভোগীর হাতে হাঁস-মুরগি দেওয়ার অনুমোদন কোথায় এবং এসব সম্পদের আর্থিক মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল?
প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন
মিতালী চাকমার নামে মৎস্য চাষের জন্য বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ২০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মিতালী চাকমা জানান, প্রকল্পের আওতায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্যের পরিবর্তে অর্থ প্রদান এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় টাকা দেওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
প্রকল্পটি সরেজমিনে পরিদর্শনের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং কবে এলাকায় ফিরবেন, তা নিশ্চিত নয়।
ফলে বাঁধটির বাস্তব অস্তিত্ব, নির্মাণের পরিমাণ ও মান, প্রকল্পের ব্যয় এবং বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্যের প্রকৃত ব্যবহার; এসব বিষয় সরেজমিনে যাচাই করা প্রয়োজন।
চার বরাদ্দপ্রাপ্তের যোগাযোগ নম্বর নেই
বরাদ্দের তালিকায় থাকা থ্যাংকু চাকমা, মিনা চাকমা, ইলু চাকমা ও জুলিয়ান চাকমার ক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বর পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
তাঁদের নামে যথাক্রমে ১৮, ১২, ২০ ও ১৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ রয়েছে।
তাঁরা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন কি না, বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্য পেয়েছেন কি না এবং তাঁদের নামে প্রকল্পগুলো বাস্তবে রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার পাশাপাশি সরেজমিনে যাচাই জরুরি।
একটি এলাকার ১১ জনের নামে ২০৫ মেট্রিক টন
বরাদ্দের তালিকায় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে মহালছড়ির বাবুপাড়া-থলিপাড়া এলাকার ১১ জনকে ঘিরে।
তালিকা অনুযায়ী, এই ১১ জনের নামে মোট ২০৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মোট ৩৫০ মেট্রিক টনের মধ্যে যা প্রায় ৫৯ শতাংশ।
এই ১১ জনের মধ্যে কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতার অভিযোগ থাকায় বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
শুধু কাগজে-কলমে বরাদ্দ দেখানো হয়েছে, নাকি প্রকৃতপক্ষে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে—তা নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে তদন্ত জরুরি।
বরাদ্দের তালিকা —
ক্রম বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি প্রকল্প বরাদ্দ
১ মিতালী চাকমা বাঁধ নির্মাণ ২০ মেট্রিক টন
২ সুহাস রঞ্জন চাকমা মিশ্র ফলজ বাগান ২০ মেট্রিক টন
৩ উগ্য মারমা মৎস্য চাষ ২০ মেট্রিক টন
৪ উজ্জয়িনী মারমা ছাগল ও হাঁস-মুরগি পালন ২০ মেট্রিক টন
৫ জীবক খীসা দেশীয় গরু পালন ২০ মেট্রিক টন
৬ ডিউই মারমা শুকর ও হাঁস-মুরগি পালন ২০ মেট্রিক টন
৭ কান্তি চৌধুরী মৎস্য চাষ ২০ মেট্রিক টন
৮ দোঅংগ্য মারমা ফলজ বাগান সৃজন ২০ মেট্রিক টন
৯ মংনি মারমা কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় ১৫ মেট্রিক টন
১০ নেইমামা মারমা হাঁস-মুরগি পালন ১২ মেট্রিক টন
১১ মিসাইন্দা মারমা উচ্চ ফলনশীল বড়ই চাষ ১৮ মেট্রিক টন
১২ থৈইঅংগ্য মারমা গবাদিপশু পালন ২০ মেট্রিক টন
১৩ সুইপ্রুচাই মারমা মৎস্য চাষ ১৫ মেট্রিক টন
১৪ চিংম্রাস্রাং মারমা দেশীয় হাঁস-মুরগি পালন ১০ মেট্রিক টন
১৫ অংমাপ্রু মারমা শুকর পালন ১৫ মেট্রিক টন
১৬ থ্যাংকু চাকমা কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় ১৮ মেট্রিক টন
১৭ মিনা চাকমা হাঁস-মুরগি পালন ১২ মেট্রিক টন
১৮ ইলু চাকমা ফলজ বাগান সৃজন ২০ মেট্রিক টন
১৯ জুলিয়ান চাকমা উচ্চ ফলনশীল বড়ই চাষ ১৫ মেট্রিক টন
২০ মো. মফিজুল আলম গবাদিপশু পালন ২০ মেট্রিক টন
মোট ৩৫০ মেট্রিক টন
বরাদ্দকৃত খাদ্যশস্যের প্রকৃত বিতরণ, প্রকল্পের বাস্তবায়ন এবং উপকারভোগীদের হাতে বরাদ্দের সমপরিমাণ সুবিধা পৌঁছেছে কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, প্রকল্পের হিসাব এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করলে অনিয়মের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে।
তদন্তের দাবি
সরকারি খাদ্যশস্যের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার রক্ষায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
তদন্তের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ৩৫০ মেট্রিক টন চালের বরাদ্দ, উত্তোলন, পরিবহন ও বিতরণের তথ্য, উপকারভোগীদের স্বাক্ষর, চালের পরিবর্তে অর্থ বা সম্পদ দেওয়ার প্রমাণ এবং প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বরাদ্দের তালিকায় থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকল্প বাস্তবে রয়েছে কি না, প্রকল্পের কাজ কতটুকু হয়েছে এবং সরকারি বরাদ্দের বিপরীতে প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন
প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে চালের পরিবর্তে নগদ অর্থ, গরু বা হাঁস-মুরগি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন, হিসাব ও নথিপত্র কী বলছে—তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বরাদ্দের আর্থিক মূল্যায়নের বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
চলমান...