সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), জন্মনিবন্ধন সনদ ও পাসপোর্ট। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় এসব চক্র ভুয়া নাম-ঠিকানা ও অন্যের পরিচয় ব্যবহার করে অর্থের বিনিময়ে এসব গুরুত্বপূর্ণ নথি তৈরি করে দিচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফরিদপুর ও চট্টগ্রামের স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিচয় ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভুয়া এনআইডি কিংবা অন্যের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একাধিক মোবাইল সিমও সংগ্রহ করছে কেউ কেউ। এসব সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্যও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে গিয়ে অপরাধ বা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের জালিয়াতির কারণে বিদেশের শ্রমবাজারেও বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, স্থানীয় কিছু অসাধু দালাল ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসাজশ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য এনআইডি, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরি করা সম্ভব নয়। তাই শুধু রোহিঙ্গাদের শনাক্ত করাই নয়, তাদের সহযোগিতাকারী চক্রকেও আইনের আওতায় আনা জরুরি।
আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) সূত্র জানায়, বিভিন্ন অপরাধে গ্রেপ্তার রোহিঙ্গাদের জিজ্ঞাসাবাদে এনআইডি, পাসপোর্ট ও মোবাইল সিম সংগ্রহের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এপিবিএন সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার (মিডিয়া) আসমা বেগম রিটা বলেন, স্থানীয় কিছু অসাধু দালাল চক্রের সদস্য ও কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করা কঠিন।
তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ ও সীমান্ত এলাকাসহ যেসব স্থানে জালিয়াত চক্র সক্রিয় রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য সুনির্দিষ্ট ও কঠোরভাবে ট্র্যাকযোগ্য ডেডিকেটেড সিম চালুর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। পাসপোর্ট ও এনআইডি ইস্যুর ক্ষেত্রে বায়োমেট্রিক যাচাই ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, জাল টাকা এবং মানবপাচার-সংক্রান্ত ঘটনায় রোহিঙ্গাদের গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে জাল নথি তৈরির বিষয়টি সামনে আসে।
এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-১৫-এর জামতলী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হাফেজ (২০) গত ২২ জুন রাতে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে নিখোঁজ হন। ৪ জুলাই ক্যাম্পের ব্লক-এইচ/৭-এর একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে তার পচা ও অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই বাদী হয়ে উখিয়া থানায় ১৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। পরে নয়জনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রধান আসামি মোহাম্মদ রফিক আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে রোহিঙ্গাদের এনআইডি, পাসপোর্ট ও মোবাইল সিম সংগ্রহের বিষয়ে তথ্য উঠে আসে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া ৪ জুন ৯ নম্বর ক্যাম্প থেকে শিশু আলহাম অপহৃত হওয়ার পর ১৪ জুন তার বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাতেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বিভিন্ন তথ্য উঠে আসে।
এপিবিএন-১৪ সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে জাল টাকা, অস্ত্র, মাদক এবং কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির বিষয়টি সামনে আসে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ৭৮ হাজার টাকার জাল নোটসহ আব্দুল আমিন নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রলোভনের অভিযোগে করিম উল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। ১২ মার্চ ১৩ হাজার ৩০০ ইয়াবাসহ একই পরিবারের চারজন এবং ১৮ মে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন, গুলি ও ৪৩ হাজার ৬০০ পিস ইয়াবাসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের সময় রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র ও নথি জালিয়াতির বিভিন্ন তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে আসে বলে সূত্র জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রোহিঙ্গাদের হাতে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট পৌঁছানোর ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে তা শুধু অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা নয়, দেশের জাতীয় নিরাপত্তা, বৈদেশিক শ্রমবাজার ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জন্মনিবন্ধন, এনআইডি ও পাসপোর্ট তৈরির প্রতিটি ধাপে কঠোর যাচাই এবং জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।