
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এ ঘটনা ঘটে। মৃত মো. জহিরুল হকের স্ত্রী সাজেদা আক্তার তাঁর শাশুড়ি হাজেরা খাতুনকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজের কাগজ তৈরি করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ফেনী পৌর এলাকার রামপুর মৌজার সাড়ে ৪ শতক জমি বিক্রি করা।
সোমবার বিকেলে সাবরেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দলিল রেজিস্ট্রেশনের জন্য কাগজপত্র জমা দেওয়া হলে ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিমের সন্দেহ হয়। কাগজপত্রে তথ্যের গরমিল দেখতে পেয়ে তিনি সাজেদা আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। একপর্যায়ে সাজেদা স্বীকার করেন, তাঁর শাশুড়ি প্রকৃতপক্ষে জীবিত আছেন। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর সাবরেজিস্ট্রার রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম স্থগিত করেন এবং ভুয়া কাগজপত্র জব্দ করেন।
ঘটনার পর মঙ্গলবার দুপুরে প্রতারণার শিকার হাজেরা খাতুন নিজে সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ে হাজির হন। তিনি ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং যথাসময়ে জালিয়াতি শনাক্ত করায় সাবরেজিস্ট্রারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। বুধবার বিষয়টি ফেনী শহরে জানাজানি হলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ১৯ আগস্ট জহিরুল হক মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে এবং বৃদ্ধা মাকে রেখে যান। তবে ওই বছরের জুলাই মাসে সোনাগাজী উপজেলার বগাদানা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নেওয়া একটি ওয়ারিশ সনদে কৌশলে তাঁর মায়ের নাম বাদ দেওয়া হয়। পরে ওই সনদের ভিত্তিতেই জমাখারিজ সম্পন্ন করা হয়েছিল।
ফেনী ট্রাংক রোডের ব্যবসায়ী আবদুর রহিম বলেন, “ঘটনাটি শুনে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। নিজের স্বার্থের জন্য মানুষ কতটা নিচে নামতে পারে, এটি তার চরম উদাহরণ। জীবিত শাশুড়িকে কাগজে-কলমে মৃত বানিয়ে জমি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা কোনো স্বাভাবিক মানসিকতার কাজ হতে পারে না। তবে সাবরেজিস্ট্রার যেভাবে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বিষয়টি ধরে ফেলেছেন, সে জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার। এ ধরনের কঠোর নজরদারি না থাকলে সাধারণ মানুষ ও অসহায় প্রবীণরা নিরাপদে থাকতে পারবেন না। প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়।”
গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, “খবরটি শোনার পর থেকে মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে আছে। যেখানে আমাদের সমাজে বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান ও যত্নে রাখার কথা, সেখানে জমির লোভে স্বজনরাই তাঁকে জালিয়াতি করে মৃত বানিয়ে দিচ্ছেন। এটি শুধু জমি বিক্রির চেষ্টা নয়, পারিবারিক মূল্যবোধেরও চরম অবক্ষয়। আমরা ফেনীবাসী হিসেবে এ ঘটনায় খুবই লজ্জিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে আমাদের দাবি, শুধু জমি বিক্রির চেষ্টা ঠেকানোই নয়, এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।”
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক আবু ছালেহ টিপু বলেন, তাঁকে যে ওয়ারিশ সনদ ও জমাখারিজের কাগজ দেওয়া হয়েছিল, তিনি সে অনুযায়ী দলিল প্রস্তুত করেছিলেন। পরবর্তীতে কাগজপত্র ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়।
ফেনী সদর সাবরেজিস্ট্রার আবদুর রহমান মোহাম্মদ তামিম বলেন, জমি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের জালিয়াতি থেকে রক্ষা করতে এবং সঠিক মালিকানা নিশ্চিত করতে তাঁরা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “ভুয়া কাগজপত্র ও তথ্য গোপন করে দলিল হস্তান্তরের চেষ্টা করা হলে তা আমাদের নজরে আসে। শাশুড়িকে মৃত দেখিয়ে ভুয়া সনদ তৈরির বিষয়টি স্বীকার করায় দলিলটি জব্দ করা হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি বা যেকোনো ধরনের প্রতারণা রোধে আমাদের কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।”