সুন্দরবনঘেঁষা বাগেরহাটের উপকূলীয় জনপদে বদলে যাচ্ছে কৃষির চিত্র। একসময় লবণাক্ততার কারণে যেখানে ধান ছাড়া অন্য ফসল ফলানো কঠিন ছিল, সেই জমি এখন শসা, লাউ, কুমড়া, করলা, ঝিঙে, বেগুনসহ নানা সবজির সবুজে ভরে উঠেছে। চলতি মৌসুমে হয়েছে বাম্পার ফলন। তবে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় কমেছে অনেক সবজির দাম। ফলে ভালো ফলন পেয়েও কাঙ্ক্ষিত লাভের মুখ দেখছেন না অনেক কৃষক।
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ, চিতলমারী, মোল্লাহাট, ফকিরহাট, মোংলা, রামপাল, সদর, কচুয়া ও শরণখোলা জেলার নয় উপজেলাতেই এবার ব্যাপকভাবে সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে শসার আবাদ ও উৎপাদনে এগিয়ে রয়েছে মোরেলগঞ্জ। প্রতিদিন উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শতাধিক ট্রাকে শসাসহ নানা সবজি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।
সরেজমিনে মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, ফসলি জমি ও মৎস্য ঘেরের ভেড়িতে সারি সারি শসার গাছ। কোথাও গাছে ঝুলছে অসংখ্য শসা, আবার কোথাও কৃষকেরা ব্যস্ত ফসল সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণে। ভোর থেকেই শুরু হয় শসা তোলা। পরে পাইকারেরা কৃষকের ক্ষেত বা বাড়ি থেকেই সবজি কিনে ট্রাকে করে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যাচ্ছেন।
কৃষকেরা জানান, বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যেই শসা গাছে ফলন শুরু হয়। এরপর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। পরিচর্যা ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এক একর জমি থেকে প্রতিদিন ৬ থেকে ৯ মণ পর্যন্ত শসা পাওয়া সম্ভব।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় শসার ব্যাপক ফলন হয়েছে। এবার ৯০ হাজার টনের বেশি শসা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হবে মোরেলগঞ্জ উপজেলায়।
কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ শসা দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। অনেক কৃষক সরাসরি পাইকারদের কাছে ফসল বিক্রি করায় মধ্যস্বত্বভোগীর খরচও কিছুটা কমছে।
মোরেলগঞ্জের কৃষক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, এক একর জমিতে শসা চাষ করেছেন তিনি। প্রতিদিন পাঁচ থেকে আট মণ পর্যন্ত শসা বিক্রি করছেন। ফলন ভালো হওয়ায় তিনি সন্তুষ্ট হলেও বাজারদর আরও ভালো হলে লাভ বেশি হতো বলে জানান।
নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের গুয়াতলা গ্রামের শসাচাষি সাব্বির হোসেন সুমনসহ স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জানান, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার শসার ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি বিভাগের পরামর্শও তারা পেয়েছেন।
বর্তমানে কোনো কোনো বাজারে প্রতি কেজি শসা ১৩ থেকে ১৫ টাকা এবং কোথাও প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান কৃষকেরা। দাম স্থিতিশীল থাকলে লাভের আশা করছেন তারা।
মোরেলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নে সবজি আবাদে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সময়মতো বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ পাওয়ায় এ বছর শসাসহ বিভিন্ন সবজির ফলন ভালো হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি মৌসুমে মোরেলগঞ্জে প্রায় ৬০ হাজার টন শসা উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। কৃষকদের চাষাবাদ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
চিতলমারী উপজেলার কলাতলা, হিজলা, বড়বাড়িয়া, শিবপুর, সদর, চরবানিয়ারী ও সন্তোষপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মৎস্য ঘেরের পাড় ও ভেড়িতে ব্যাপক সবজি চাষ হয়েছে। লাউ, কুমড়া, করলা ও শসাসহ বিভিন্ন সবজি উৎপাদন করছেন কৃষক-কৃষাণিরা।
তবে এখানকার অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ব্যাংক, এনজিও ও স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করায় বাজারদর কমে যাওয়ায় এখন ঋণ পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তারা।
দুর্গাপুর গ্রামের সবজি চাষি সুব্রত মণ্ডল বলেন, ভালো দামের আশায় ঋণ নিয়ে সবজি চাষ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে শসা প্রতি কেজি ৮ থেকে ১০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। করলার দামও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এতে উৎপাদন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে কম দামে সবজি কিনে শহরের বাজারে বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে উৎপাদনের মূল ঝুঁকি নেওয়া কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চিতলমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. সিফাত-আল-মারুফ জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল জাতের লাউ, কুমড়া, করলা, শসাসহ বিভিন্ন সবজি চাষ হয়েছে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে কোনো কোনো সময় বাজারে সরবরাহ বেড়ে দাম কমে যেতে পারে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে চাষিদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
বাগেরহাট জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম তরফদার বলেন, সবজির বাজারদর কমার পেছনে কারও কারসাজির অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কৃষকেরা নির্ধারিত বাজার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ন্যায্যমূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ নিতে পারেন।
কৃষকেরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। এজন্য বাজার মনিটরিং জোরদার, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষকদের মতে, লবণাক্ত জমিতে সবজি উৎপাদনের মাধ্যমে উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই সম্ভাবনা ধরে রাখতে সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক কৃষি প্রশিক্ষণ, মানসম্মত বীজ ও সার সরবরাহ এবং উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলেই বাম্পার ফলনের সঙ্গে কৃষকের মুখেও সত্যিকারের হাসি ফুটবে।