আপাতত থামল ৫০ হাজার বাংলাদেশির ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া

সুজন দে

জাতীয়

কোটাসংক্রান্ত জটিলতা ও অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগের মুখে মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর সম্ভাব্য বহিষ্কারের যে আশঙ্কা তৈরি

2026-08-17T16:06:05+00:00
2026-08-17T16:18:36+00:00
  সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
২ ভাদ্র ১৪৩৩
 
সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
জাতীয়
কূটনৈতিক তৎপরতা
আপাতত থামল ৫০ হাজার বাংলাদেশির ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া
সুজন দে
সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ৪:০৬ পিএম  আপডেট: ১৭.০৮.২০২৬ ৪:১৮ পিএম
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জুর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। ছবি : সংগৃহীত

কোটাসংক্রান্ত জটিলতা ও অভিবাসন নীতির কঠোর প্রয়োগের মুখে মালদ্বীপে অবস্থানরত প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশি কর্মীর সম্ভাব্য বহিষ্কারের যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত কেটে গেছে। বাংলাদেশের জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা, দ্বিপক্ষীয় আলোচনা এবং মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ধারাবাহিক যোগাযোগের পর মালদ্বীপ সরকার সম্ভাব্য ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাময়িক এই স্থগিতাদেশে একদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মালদ্বীপের অভিবাসন ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় জাতীয়তা ও কর্মীসংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা সেই সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈধ, অবৈধ ও অনিবন্ধিত কর্মীদের পাশাপাশি বৈধভাবে কর্মরত অনেক বাংলাদেশিও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিষয়টি মানবিক ও অর্থনৈতিক- দুই দিক থেকেই তুলে ধরা হয়। হঠাৎ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাদের জীবিকা ও পরিবারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মালদ্বীপের পর্যটন, নির্মাণ, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়।

সংশ্লিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে- অভিবাসন নীতি ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ স্বীকার করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে অবদান রাখা কর্মীদের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব কর্মীর বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং যারা নিয়মিতভাবে কাজ করছেন, তাদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এক লাখের আইনি সীমা: মালের অভিবাসন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মালদ্বীপের বিদ্যমান অভিবাসন নীতি ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় একটি নির্দিষ্ট দেশ থেকে সর্বোচ্চ এক লাখ বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনি ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যা বেড়ে প্রায় এক লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছে গেছে। নির্ধারিত এই সীমা প্রায় ৫০ হাজার অতিক্রম করায় শুধু অনিবন্ধিত বা কাগজপত্রহীন কর্মীরাই নন, জাতীয়তার কোটা ব্যবস্থাপনার জটিলতায় বৈধভাবে কর্মরত অনেক বাংলাদেশি শ্রমিকের অবস্থানও চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকটময় এই পরিস্থিতিতে মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলামের প্রাথমিক মধ্যস্থতা ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে প্রবাসীদের এই সংবেদনশীল বিষয়টি সমাধানে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা যুক্ত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক মালদ্বীপ সফর এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।

সূত্র বলছে, কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, হুট করে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে ফেরত পাঠালে তা শুধু প্রবাসীদের জন্য মানবিক সংকটই তৈরি করবে না, বরং মালদ্বীপের উদীয়মান অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি দেশটির সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জুর সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের বৈঠক

মালের বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন সূত্রে জানা গেছে, মালদ্বীপের অর্থনীতি মূলত শ্রমনির্ভর। বিশেষ করে দেশটির সবচেয়ে লাভজনক পর্যটন ও রিসোর্ট শিল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য সেবামূলক খাতে বাংলাদেশি প্রবাসীদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। কূটনৈতিক বৈঠকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের পক্ষ থেকে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে বাংলাদেশি কর্মীদের অপরিহার্য ভূমিকা ও অবদান তুলে ধরা হয়। সফল আলোচনার পর মালদ্বীপ সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ডিপোর্টেশন প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখতে সম্মত হয়।

মালদ্বীপের অর্থনীতিতে বাংলাদেশিদের ভূমিকা: মালদ্বীপের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে পর্যটন ও সেবাখাতনির্ভর। দেশটির হোটেল ও রিসোর্ট, নির্মাণ, পরিবহন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিচ্ছন্নতা এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি কর্মীরা কাজ করছেন।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় এসব খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন ও নির্মাণ খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশি কর্মীদের ভূমিকা মালদ্বীপের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ঢাকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়।

কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বাস্তবতাই মালদ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করেছে। ফলে সম্ভাব্য ব্যাপক বহিষ্কারের পরিবর্তে আপাতত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোলা হয়েছে।

শুধু স্থগিতাদেশ নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান: তবে কূটনৈতিকভাবে ডিপোর্টেশন আপাতত ঠেকানো গেলেও সংকট পুরোপুরি শেষ হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে অনিবন্ধিত ও কাগজপত্রের জটিলতায় থাকা বাংলাদেশিদের যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিবন্ধনের আওতায় আনা এবং বৈধ কর্মীদের অবস্থান নিশ্চিত করা।

একই সঙ্গে মালদ্বীপের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কূটনৈতিক ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু সাধারণ বা অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর নির্ভর না করে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক মানের সনদধারী কর্মী পাঠাতে হবে।

এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে সমঝোতা স্মারক বা শ্রমচুক্তি করা জরুরি। পাশাপাশি মালদ্বীপে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।

শ্রম কূটনীতিতে নতুন বার্তা: কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালদ্বীপে সাময়িকভাবে ডিপোর্টেশন স্থগিতের ঘটনাটি বাংলাদেশের শ্রম কূটনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, বিদেশের শ্রমবাজারে কর্মীদের বৈধতা, দক্ষতা, সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও এখন বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের অংশ হওয়া প্রয়োজন।

তাদের মতে, সাময়িক স্বস্তিকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে হলে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ চালু রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশির সম্ভাব্য বহিষ্কার আপাতত স্থগিত হওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে কূটনৈতিক মহলের দৃষ্টি এখন পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—এই সাময়িক সমাধানকে কীভাবে একটি টেকসই শ্রমচুক্তি, সুশৃঙ্খল কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং মালদ্বীপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে রূপ দেওয়া যায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান কূটনৈতিক সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে মালদ্বীপ শুধু বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার শ্রম কূটনীতিতেও বাংলাদেশের জন্য একটি সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে।



Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: