
বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সাময়িক এই স্থগিতাদেশে একদিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে, অন্যদিকে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মালদ্বীপের অভিবাসন ও শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনায় জাতীয়তা ও কর্মীসংখ্যা নিয়ে নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা সেই সীমার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় বৈধ, অবৈধ ও অনিবন্ধিত কর্মীদের পাশাপাশি বৈধভাবে কর্মরত অনেক বাংলাদেশিও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিষয়টি মানবিক ও অর্থনৈতিক- দুই দিক থেকেই তুলে ধরা হয়। হঠাৎ বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হলে তাদের জীবিকা ও পরিবারে বড় ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি মালদ্বীপের পর্যটন, নির্মাণ, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবা খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট একটি কূটনৈতিক সূত্র জানায়, আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্ট করেছে- অভিবাসন নীতি ও আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ স্বীকার করে। তবে দীর্ঘদিন ধরে মালদ্বীপের অর্থনীতিতে অবদান রাখা কর্মীদের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত ও ধাপে ধাপে সমাধান প্রয়োজন। বিশেষ করে যেসব কর্মীর বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং যারা নিয়মিতভাবে কাজ করছেন, তাদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সংকটময় এই পরিস্থিতিতে মালেতে বাংলাদেশ হাইকমিশনার ড. নাজমুল ইসলামের প্রাথমিক মধ্যস্থতা ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তীতে প্রবাসীদের এই সংবেদনশীল বিষয়টি সমাধানে রাজনৈতিক উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা যুক্ত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সাম্প্রতিক মালদ্বীপ সফর এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সফল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়।
সূত্র বলছে, কূটনৈতিক আলোচনায় বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে যে, হুট করে বিপুলসংখ্যক কর্মীকে ফেরত পাঠালে তা শুধু প্রবাসীদের জন্য মানবিক সংকটই তৈরি করবে না, বরং মালদ্বীপের উদীয়মান অর্থনীতিতেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টি দেশটির সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের পক্ষ থেকে আলোচনায় এসব খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন ও নির্মাণ খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ বাংলাদেশি কর্মীদের ভূমিকা মালদ্বীপের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে ঢাকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়।
কূটনৈতিক সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বাস্তবতাই মালদ্বীপের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করেছে। ফলে সম্ভাব্য ব্যাপক বহিষ্কারের পরিবর্তে আপাতত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোলা হয়েছে।
একই সঙ্গে মালদ্বীপের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কূটনৈতিক ও শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ভবিষ্যতে শুধু সাধারণ বা অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর ওপর নির্ভর না করে হোটেল ও রিসোর্ট ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক মানের সনদধারী কর্মী পাঠাতে হবে।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে সমঝোতা স্মারক বা শ্রমচুক্তি করা জরুরি। পাশাপাশি মালদ্বীপে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের একটি নির্ভুল ও প্রযুক্তিনির্ভর ডেটাবেজ তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলা সহজ হবে।
তাদের মতে, সাময়িক স্বস্তিকে স্থায়ী সমাধানে রূপ দিতে হলে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ চালু রাখতে হবে। একই সঙ্গে দুই দেশের পররাষ্ট্র, প্রবাসী কল্যাণ ও শ্রমসংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
প্রায় ৫০ হাজার বাংলাদেশির সম্ভাব্য বহিষ্কার আপাতত স্থগিত হওয়ায় প্রবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে কূটনৈতিক মহলের দৃষ্টি এখন পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে—এই সাময়িক সমাধানকে কীভাবে একটি টেকসই শ্রমচুক্তি, সুশৃঙ্খল কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং মালদ্বীপের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানে রূপ দেওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান কূটনৈতিক সুযোগটি কাজে লাগাতে পারলে মালদ্বীপ শুধু বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার হিসেবেই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার শ্রম কূটনীতিতেও বাংলাদেশের জন্য একটি সফল মডেল হয়ে উঠতে পারে।