নিরাপদ ও মানসম্মত মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মৎস্যপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) আয়োজনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ বিনির্মাণে মৎস্যসম্পদ: বর্তমান প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, বিশ্বে এখন খাদ্যের অভাবের চেয়ে নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্যের চাহিদা বেশি। তাই মাছ উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণ ও নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারলে মৎস্য খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, বর্তমানে মাছের খাতে কী সমস্যা রয়েছে, ভবিষ্যতে কী সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এবং দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কী ধরনের মাছের চাহিদা রয়েছে, এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধান করা গেলে মৎস্য খাতে দ্রুত অগ্রগতি সম্ভব।
মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে পর্যাপ্ত অভয়াশ্রম নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন মন্ত্রী। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরিবেশগত চাপ মাছের স্বাভাবিক উৎপাদন ও প্রজননে বাধা সৃষ্টি করছে উল্লেখ করে তিনি পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি গ্রহণের আহ্বান জানান।
মন্ত্রী বলেন, সীমিত জায়গায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অধিক মাছ উৎপাদনের সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছের সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব। তবে শুধু প্রবাসীদের চাহিদা নয়, যে দেশে মাছ রপ্তানি করা হবে, সেই দেশের ভোক্তাদের পছন্দ ও বাজার চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন করতে হবে।
চিংড়ি, কাঁকড়া, কুচিয়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর রপ্তানি সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে উৎপাদনের পাশাপাশি পোনা উৎপাদন ও প্রজনন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন ও লালন-পালন করা গেলে উৎপাদন ও রপ্তানি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এমপি বলেন, মাছের উৎপাদন বাড়াতে হলে মাছের বেড়ে ওঠা ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নদী-নালা দখল, নাব্যতা সংকট ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে পানিদূষণের কারণে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাছের আবাসস্থল ফিরিয়ে আনতে নদী-খালের নাব্যতা বজায় রাখার পাশাপাশি নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন জরুরি। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বর্তমান সরকার আবারও নদী ও খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও নদী পুনঃখননের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে মাছের প্রজনন ও বিচরণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে।
মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের বিষয়েও উদ্বেগ জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে একদিকে খামারিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ বিষয়ে খামারিদের সচেতন করতে জেলাভিত্তিক সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. মো. লতিফুল ইসলামের সভাপতিত্বে সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনক, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মশিউর রহমান।