রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের এক বছর পর প্রকাশিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে পাইলটের উড্ডয়ন প্রশিক্ষণের ঘাটতি, পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে প্রতিবেদনে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাণহানি বাড়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে, এক বছর পেরিয়ে গেলেও নিহত ও আহতদের পরিবার এখনো প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ পায়নি।
তদন্ত কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই সংঘটিত ওই দুর্ঘটনার পেছনে বিমানের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না। বরং মানবিক ভুল এবং প্রশিক্ষণ ও তদারকির ঘাটতিই ছিল প্রধান কারণ।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বিমানবাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামের এটি ছিল প্রথম একক (ফার্স্ট সলো) উড্ডয়ন। সংকটপূর্ণ পরিস্থিতিতে তিনি কার্যকরভাবে বিমান নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। পাশাপাশি গ্রাউন্ড সুপারভাইজার ও অফিসার কমান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব ছিল। এমনকি প্রশিক্ষণের নির্ধারিত সিলেবাসের বাইরে গিয়ে পাইলটকে ভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার (এফডিআর) বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিমানটি ঘুরে আসার সময় মাত্র চার সেকেন্ডের মধ্যে এর ব্যাংক অ্যাঙ্গেল ৫৯ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৩ ডিগ্রিতে পৌঁছে যায়। নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে গিয়ে পাইলট কন্ট্রোল স্টিকে অতিরিক্ত টান দেওয়ায় অ্যাঙ্গেল অব অ্যাটাক নিরাপদ সীমা অতিক্রম করে এবং বিমানটি ‘স্টল’ অবস্থায় পড়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, বিমানের উইন্ডশিল্ডে পাওয়া একটি কালো দাগ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, কোনো পাখি বা উড়ন্ত বস্তুর আঘাত পাইলটকে বিভ্রান্ত করে তাৎক্ষণিক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে থাকতে পারে। তবে এটিকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
কমিশনের প্রতিবেদনে মাইলস্টোন স্কুলের হায়দার আলী ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থারও সমালোচনা করা হয়েছে। ভবনটিতে জরুরি বহির্গমনের জন্য মাত্র একটি সিঁড়ি ছিল, যেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় কমপক্ষে তিনটি সিঁড়ি থাকা উচিত ছিল। দুর্ঘটনার পর আগুন সিঁড়ির সামনেই ছড়িয়ে পড়ায় অনেক শিক্ষার্থী বের হওয়ার সুযোগ পাননি, ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়। পাশাপাশি বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় উচ্চতা সীমা লঙ্ঘন করে গড়ে ওঠা ভবনগুলোও ঝুঁকি বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে তদন্ত কমিশন নিহত শিশুদের পরিবারকে এক কোটি টাকা এবং প্রাপ্তবয়স্কদের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করলেও এক বছর পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের সুপারিশও এখনো কার্যকর হয়নি।
নিহতদের স্বজন ও আহত ব্যক্তিরা অভিযোগ করেছেন, সরকার তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই সীমিত পরিমাণ অনুদানের প্রস্তাব দিয়েছিল, যা তারা প্রত্যাখ্যান করেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ক্ষতিপূরণের একটি মডেল তৈরি করলেও সেটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
তদন্ত কমিশনের সদস্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে হতাহতদের প্রতি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব পালন করা উচিত।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হলে ২৮ জন শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৬ জন নিহত হন। ঘটনার পর গঠিত ৯ সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিশন তিন মাসের বেশি সময় তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দিলেও তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। সম্প্রতি সেই প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা