বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে মেক্সিকোকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড। এবার তাদের প্রতিপক্ষ ব্রাজিলকে বিদায় দিয়ে চমক দেখানো নরওয়ে। সেমিফাইনালে উঠতে হলে থমাস টুখেলের দলের সবচেয়ে বড় ভরসা অধিনায়ক হ্যারি কেইনকে খেলতে হবে নিজের সেরাটা। একই সঙ্গে থামিয়ে রাখতে হবে নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডকে। ফলে দলীয় লড়াইয়ের পাশাপাশি নজর থাকবে দুই তারকা স্ট্রাইকারের ব্যক্তিগত দ্বৈরথেও।
গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আপাতত এগিয়ে হালান্ড। আসরে এখন পর্যন্ত তার গোল সংখ্যা ৭, যা কেইনের চেয়ে একটি বেশি। শীর্ষে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লিওনেল মেসির চেয়ে তিনি মাত্র এক গোল পিছিয়ে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অন্যদের তুলনায় একটি ম্যাচ কম খেলেই এই অবস্থানে পৌঁছেছেন নরওয়েজিয়ান এই ফরোয়ার্ড। নকআউট নিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় ফ্রান্সের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তাকে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল।
চলতি বিশ্বকাপে প্রতি ৯০ মিনিটে হালান্ডের গোলের হার ১.৮, যেখানে কেইনের ১.২। এক্সপেক্টেড গোলের (xG) দিক থেকেও এগিয়ে হালান্ড। তার xG ৪.৪, বিপরীতে কেইনের ৩.৪। অর্থাৎ, গোল করার বেশি মানসম্পন্ন সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন নরওয়ের এই স্ট্রাইকার।
হালান্ডের সাতটি গোলই এসেছে ওপেন প্লে থেকে। অন্যদিকে কেইনের ছয় গোলের মধ্যে দুটি এসেছে ক্রোয়েশিয়া ও মেক্সিকোর বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে। দুই ফুটবলার মিলিয়ে বক্সের বাইরে থেকে একমাত্র গোলটি করেছেন হালান্ড, সেটিও ব্রাজিলের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক শটে। গোলের ধরনেও বৈচিত্র্য রয়েছে তার—বাম পায়ে চারটি, ডান পায়ে দুটি এবং হেডে একটি। অন্যদিকে কেইনের তিনটি গোল এসেছে হেড থেকে এবং তিনটি ডান পায়ে।
তবে মৌসুমের সামগ্রিক পারফরম্যান্সে এগিয়ে রয়েছেন কেইন। ২০২৩ সালে টটেনহ্যাম ছেড়ে বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেওয়ার পর ২০২৫-২৬ মৌসুমটি তার ক্যারিয়ারের সেরা হয়ে উঠেছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে পেনাল্টি গোলসহ ক্লাব ও দেশের হয়ে তার মোট গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩-এ। যা এক মৌসুমে সর্বকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ১৯৭২-৭৩ মৌসুমে গার্ড মুলারের ৭২ গোলের রেকর্ড। তার গোলগুলো বায়ার্নকে লিগ ও কাপ—দুই শিরোপাই জিততে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর ফলে ২০১১-১২ মৌসুমে লিওনেল মেসির ৮২ গোলের পর এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোল করা ফুটবলারদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন কেইন।
অন্যদিকে হালান্ডও দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন। প্রিমিয়ার লিগে ২৭ গোল করে চার মৌসুমে তৃতীয়বারের মতো গোল্ডেন বুট জিতেছেন তিনি। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৬৩ ম্যাচে করেছেন ৫৮ গোল। এর মধ্যে ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৩৮টি এবং নরওয়ের হয়ে মাত্র ১১ ম্যাচে করেছেন ২০ গোল।
২০২৪ সালের পর থেকে নরওয়ের হয়ে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করতে ব্যর্থ হননি হালান্ড। বর্তমানে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। এই সময়ে করেছেন ২৭ গোল। ব্রাজিল, সেনেগাল, ইরাক, ইতালি ও এস্তোনিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোলের পাশাপাশি ইসরায়েল ও কাজাখস্তানের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং মলদোভার বিপক্ষে এক ম্যাচে পাঁচ গোলও রয়েছে তার ঝুলিতে।
দেশের জার্সিতে ৫৪ ম্যাচে হালান্ডের গোল এখন ৬২টি, যা তাকে নরওয়ের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ইয়োরগেন জুভের গোলসংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ এটি।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও কেইন। ১১৯ ম্যাচে তার গোল ৮৫টি, যা ওয়েন রুনির চেয়ে ৩২টি বেশি। গ্রুপ পর্বে পানামার বিপক্ষে গোল করে তিনি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবেও গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে যান।
গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যদি দুজনের গোলসংখ্যা সমান হয়, তাহলে বর্তমান অবস্থায় এগিয়ে থাকবেন কেইন। কারণ মেক্সিকোর বিপক্ষে জুড বেলিংহ্যামকে একটি গোল করিয়েছেন তিনি, যেখানে হালান্ডের কোনো অ্যাসিস্ট নেই। সমান গোল হলে টাইব্রেকারে অ্যাসিস্ট বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পরিসংখ্যান বলছে, দলের আক্রমণ গড়ে তুলতেও কেইনের অবদান বেশি। গত মৌসুমে হালান্ডের ১৭টির বিপরীতে তিনি ৩৫টি সুযোগ তৈরি করেছেন। পাস দিয়েছেন ৭২৭টি, যেখানে হালান্ডের ছিল ৩৮৪টি।
ক্লাব ফুটবলেও প্রতি ম্যাচে টাচের দিক থেকে এগিয়ে ছিলেন কেইন (৪৩.৮), যেখানে হালান্ডের ছিল ২২.৫। প্রতি গোলের বিপরীতে টাচেও কেইন এগিয়ে (৩২.৩ বনাম ২৭.৩)। বিশ্বকাপেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। প্রতি ম্যাচে টাচে কেইন (২৫.৪) সামান্য এগিয়ে হালান্ডের (২৫.০) চেয়ে।
তবে একটি জায়গায় এগিয়ে আছেন হালান্ড। ক্লাব মৌসুমে কেইনের ৭ অ্যাসিস্টের বিপরীতে তার অ্যাসিস্ট ছিল ৯টি। তাই হালান্ড শুধু গোল করতেই পারেন, খেলায় অন্য কোনো অবদান রাখেন না—এমন ধারণা মোটেও সঠিক নয়।