দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শেষে নতুন আশা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে যাওয়া হাজারো জেলে যাত্রার শুরুতেই বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়েছেন। প্রবল পূবালী বাতাস ও উত্তাল ঢেউয়ের কারণে গভীর সাগরে অবস্থান ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শত শত ফিশিং ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল এবং উপকূলীয় মৎস্যঘাটে নোঙর করেছে। এতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় দাদনের ঋণ, জ্বালানি ও শ্রমিক ব্যয়ের চাপ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সুন্দরবন উপকূল, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রায়েন্দা, পাথরঘাটা, বরগুনাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা ঘুরে এবং জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছ আহরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের শুরুতেই দুর্যোগ দেখা দেওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন তারা। দাদন ও ঋণের টাকায় জ্বালানি, বরফ, খাদ্যসামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে ট্রলার নিয়ে সাগরে গেলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাছ ধরার সুযোগ পাননি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত উত্তাল রয়েছে। প্রবল বাতাসে কয়েক মিটার উচ্চতার ঢেউ সৃষ্টি হওয়ায় গভীর সাগরে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ফলে শত শত ফিশিং ট্রলার সুন্দরবনের দুবলার চরসংলগ্ন ভেদাখালী খাল, মেহেরআলী, আলোরকোলসহ বিভিন্ন নিরাপদ খালে আশ্রয় নিয়েছে। একই সঙ্গে শরণখোলার রায়েন্দা, পাথরঘাটা, মহিপুর, কুয়াকাটা, নিদ্রাসখিনাসহ বিভিন্ন উপকূলীয় ঘাটেও অসংখ্য ট্রলার নোঙর করে রয়েছে।
সুন্দরবনের ভেদাখালী খালে আশ্রয় নেওয়া বাগেরহাটের বগা এলাকার ফিশিং ট্রলারের মাঝি নজরুল ইসলাম মোবাইল ফোনে বলেন, “দুই দিন ধরে সাগরে এমন ঢেউ ছিল যে ট্রলার ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরা সম্ভব হয়নি। তাই বাধ্য হয়ে সুন্দরবনের খালে আশ্রয় নিয়েছি। এখন আবহাওয়া ভালো না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই।”
শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা দাদন করে সাগরে গেছেন। কিন্তু শুরুতেই দুর্যোগে পড়ে ফিরে আসতে হয়েছে। কয়েকশ ট্রলার এখন নিরাপদ আশ্রয়ে রয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু কোনো আয় নেই।
রায়েন্দা মৎস্যঘাটের আড়তদার কবির হোসেন জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক ট্রলার সাগরে যেতেই পারেনি। গত দুই দিন ধরে ঘাটে সারিবদ্ধভাবে ট্রলার নোঙর করে থাকায় সেখানে ট্রলারের জটলা সৃষ্টি হয়েছে।
বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, উত্তাল সাগরে অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অধিকাংশ ট্রলার উপকূলে ফিরে এসেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে আবার সাগরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
উপকূলীয় ট্রলার মালিকরা জানান, একটি মাঝারি আকারের ট্রলার গভীর সাগরে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুত করতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর বড় অংশই আসে এনজিও, মহাজন কিংবা আড়তদারদের দাদন থেকে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। প্রতিটি বৈরী আবহাওয়া তাই জেলেদের জন্য শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটও বয়ে আনে।
উপকূলীয় নৌযান চালকদের মতে, বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া দেখা দিলে সুন্দরবনের নদী-খালই শত শত ট্রলারের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। বনাঞ্চলের ভেতরের খালগুলো ঢেউয়ের তীব্রতা কমিয়ে দেয়, ফলে ট্রলার ও জেলেদের জীবন রক্ষা সম্ভব হয়। তবে দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও বরফের সংকট দেখা দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
উপকূলজুড়ে এখন একটাই প্রত্যাশা—আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক হোক। কারণ, প্রতিটি বিলম্বিত দিন মানেই হাজারো জেলে পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, বাড়তে থাকা ঋণের বোঝা এবং দেশের সামুদ্রিক মৎস্য অর্থনীতিতে নতুন ক্ষতির হিসাব।