মংডু–বুথিডংয়ে বিমান হামলা, টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

ভোরের ডাক রিপোর্ট

সারাদেশ

দীর্ঘ কয়েক মাসের তুলনামূলক নীরবতার পর আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে ধারাবাহিক বিমান

2026-07-03T18:03:55+00:00
2026-07-03T18:03:55+00:00
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
সারাদেশ
মংডু–বুথিডংয়ে বিমান হামলা, টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
ভোরের ডাক রিপোর্ট
শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
দীর্ঘ কয়েক মাসের তুলনামূলক নীরবতার পর আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে ধারাবাহিক বিমান হামলা এবং বিস্ফোরণের ঘটনায় টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। গত বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একাধিক বিস্ফোরণের বিকট শব্দ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকাতেও স্পষ্টভাবে শোনা যায়। এতে টেকনাফের জাদিমুরা, শাহপরীর দ্বীপসহ নাফ নদীসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন।

সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেওয়ায় সম্ভাব্য রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থল ও নৌপথে নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। একই সঙ্গে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ৯টা ৩৭ মিনিটের দিকে পরপর চারটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দে পুরো সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ঘটে একাধিক বিস্ফোরণ। শব্দের তীব্রতা এতটাই ছিল যে সীমান্তবর্তী বহু বাড়িঘরে কম্পন অনুভূত হয়। আতঙ্কে অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। কয়েকজন বাসিন্দা সীমান্তের ওপারে আগুনের ঝলকও দেখতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ও বিকালেও রাখাইনের মংডু ও বুথিডং এলাকায় নতুন করে বিমান হামলার শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রিত অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ করে। এসব হামলায় কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন রোহিঙ্গা সূত্র দাবি করলেও হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সীমান্ত পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সীমান্ত দিয়ে যেন কোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল না ঘটে, সেজন্য বাড়ানো হয়েছে টহল। নাফ নদীতেও জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিজিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে।

সীমান্তের মানুষ বলছেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সংঘাতের সময় যেভাবে প্রায় প্রতিদিন গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যেত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই স্মৃতিকেই আবারও ফিরিয়ে এনেছে। ফলে এলাকায় নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের নাফ নদীসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা আনিছুর রহমান বলেন, হঠাৎ প্রচন্ড বিস্ফোরণে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। প্রথমে মনে হয়েছিল ভূমিকম্প হয়েছে। পরে সীমান্তের ওপারে আগুনের ঝলক দেখতে পাই। এত বড় বিস্ফোরণ অনেক দিন পর শুনলাম।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতেও এ ঘটনাকে ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। বহু রোহিঙ্গার স্বজন এখনও রাখাইনের বিভিন্ন এলাকায় বসবাস করছেন। সীমান্তের ওপারে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় অনেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

মিয়ানমারের মংডুর হাইরিয়া এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ ইলিয়াছ ২০১৭ সালে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি উখিয়ার একটি আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে তিনি জানান, মংডু ও বুথিডং এলাকায় টানা বিমান হামলায় সাধারণ মানুষ চরম আতঙ্কে রয়েছেন। তার দাবি, হামলায় কয়েকজন হতাহত হয়েছেন এবং বহু বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, এখনও হাজারো রোহিঙ্গা মংডু এলাকায় বসবাস করছেন। তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অনেকেই পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে সীমান্ত অতিক্রমের কথা ভাবছেন। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবাইর বলেন, দীর্ঘদিন পর আবারও রাখাইনে সংঘাত বাড়ায় রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে নতুন করে বাস্তুচ্যুত মানুষের ঢল সৃষ্টি হতে পারে।

স্থানীয় প্রশাসনও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও প্রশাসন সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেই সীমান্তে তার প্রভাব পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। সে কারণে সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রাখা হয়েছে। এদিকে রাখাইনভিত্তিক কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, বুথিডং উপজেলার কয়েকটি এলাকায় যুদ্ধবিমান ও সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজ ব্যবহার করে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। হামলার লক্ষ্য ছিল আরাকান আর্মির অবস্থান। তবে এসব তথ্যেরও স্বাধীন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইনে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্তে পড়বে। বিশেষ করে মংডু ও বুথিডং নাফ নদীঘেঁষা সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ায় সেখানে সামরিক অভিযান জোরদার হলে বেসামরিক মানুষের বাংলাদেশমুখী হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। ইতোমধ্যে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গার আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ নতুন করে বড় ধরনের অনুপ্রবেশের মুখে পড়লে নিরাপত্তা, অর্থনীতি, পরিবেশ ও মানবিক ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়েও নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ চললেও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির। নতুন করে বিমান হামলা শুরু হওয়ায় প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা আরও দূরে সরে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা, যার মধ্যে মংডু ও বুথিডংও রয়েছে, নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময় ওই এলাকাগুলো পুনর্দখলের লক্ষ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অভিযান ও বিমান হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। একই সঙ্গে রাখাইনে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষও অব্যাহত রয়েছে।

সব মিলিয়ে সীমান্তের ওপারে নতুন করে যুদ্ধবিমানের গর্জন শুধু রাখাইনের সংঘাতকেই তীব্র করেনি; এর অভিঘাত এখন স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশের টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তেও। সীমান্তবাসীর আতঙ্ক, রোহিঙ্গা শিবিরের উৎকণ্ঠা এবং নতুন অনুপ্রবেশের শঙ্কা, সবকিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। এখন নজর থাকবে মিয়ানমারের সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয় এবং তার প্রভাব বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকটের ওপর কতটা গভীরভাবে পড়ে।


  বিষয়:   মংডু–বুথিডংয়ে  বিমান হামলা  টেকনাফ-উখিয়া সীমান্তে  বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা 


Loading...
Loading...

সারাদেশ- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: