গাজীপুরের কালীগঞ্জে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভাইরাল ভিডিওকে কেন্দ্র করে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন আরও জোরদার হয়েছে। ভিডিওতে এক নারীর মুখে, "আমাদের মাদক বিক্রির টাকা সবার রক্তের সঙ্গে মিশে গেছে"—এমন বক্তব্য শোনা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে স্থানীয় যুবসমাজের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, তুমলিয়া গ্রামের তরুণরা কয়েকদিন ধরে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। এর অংশ হিসেবে বৃহস্পতিবার বিকেলে তারা কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে মাদক ব্যবসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। এ সময় কথিত মাদক কারবারি অহিদের বাড়িতে গিয়ে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। অভিযোগ রয়েছে, তখন তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বিতর্কিত মন্তব্য করেন এবং উপস্থিত যুবকদের উদ্দেশে হুমকিসূচক ভাষায় কথা বলেন। উপস্থিত কয়েকজন ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করলে পরে সেটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার জুমার নামাজের পর এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। কিছু যুবক অহিদের বাড়ির দিকে গেলে গ্রামের মুরব্বিরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে যুবসমাজের একটি প্রতিনিধিদলকে সঙ্গে নিয়ে তারা বাড়িতে গিয়ে ভবিষ্যতে মাদক ব্যবসা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। স্থানীয়দের দাবি, ওই পরিবার ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়াবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কাপাসিয়া মোড়ে স্থানীয় যুবসমাজ মাদকবিরোধী কর্মসূচি পালন করে। তারা মাদক নির্মূলের দাবিতে স্লোগান দেন এবং সমাজকে মাদকমুক্ত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. আফসার হোসেন বলেন, উসকানিমূলক বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে গ্রামের মুরব্বিদের মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি শান্ত রাখা সম্ভব হয়েছে। ভবিষ্যতে কেউ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়ালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।
স্থানীয় তরুণ বুলবুল, পায়েল ও সৌরভ জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, নতুন প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে সচেতনতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম কামরুল ইসলামও মাদক নির্মূলে সামাজিক সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রশাসনের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
কালীগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান আরমান বলেন, শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, ভাইরাল ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। মাদকসংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম ফজলুল হকও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে মাদকের বিরুদ্ধে 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
স্থানীয় সচেতন মহলের আশা, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান এবং যুবসমাজের ধারাবাহিক সামাজিক আন্দোলনের সমন্বয়ে কালীগঞ্জে মাদকের বিস্তার রোধে কার্যকর পরিবর্তন আসবে।