বৃদ্ধ মায়ের ওষুধ, অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা, নিজের চিকিৎসা ব্যয়, মেডিকেলে অধ্যয়নরত মেয়ের পড়াশোনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে যাওয়া ছেলের ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটছে বলে দাবি করেছেন ফরিদপুরের বোয়ালমারী পৌর সদরস্থ কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদ।
নিজের প্রতি অন্যায় ও অবিচারের অভিযোগ তুলে স্বপদে পুনর্বহালের দাবিতে শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে বোয়ালমারী বাজারের একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।
লিখিত বক্তব্যে ফরিদ আহমেদ দাবি করেন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি এখনও কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কলেজের কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীর উস্কানিতে বহিরাগত কিছু শিক্ষার্থী তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পদত্যাগের দাবি জানায়। পরবর্তীতে একই বছরের ২৮ নভেম্বর কলেজের কতিপয় শিক্ষক-কর্মচারী ও বহিরাগতদের চাপে পরিচালনা পর্ষদ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তার অভিযোগ, প্রচলিত বিধি অনুসরণ না করেই দীর্ঘদিন বরখাস্তাদেশ বহাল রাখা হয়েছে এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ তা কার্যকর রেখেছেন।
তিনি আরও দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্তে কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি এবং বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে তার বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া এবং ব্যাংক হিসাব স্থগিত রাখার অভিযোগও করেন তিনি। এর ফলে পরিবার নিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানান।
ফরিদ আহমেদ বলেন, পরে তিনি উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালতের আদেশে চাকরি ও বেতন-ভাতার অধিকার ফিরে পেলেও কলেজের একটি পক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের কারণে এখনও তাকে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও অভিযোগ করেন, অধ্যক্ষের সরকারি বাসভবন ছাড়তে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তার বাসায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেন। এসব ঘটনার জন্য তিনি কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ড. হোসনেয়ারা বেগম, প্রভাষক সৈয়দা দিল আশরাফি, প্রভাষক জাহেদা বেগম, সহকারী অধ্যাপক মো. আজহার আলী, সহকারী অধ্যাপক আ. মান্নান, সেকশন অফিসার কামরুল ইসলাম এবং অফিস সহায়ক মো. মানিক হোসেনের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ ছাড়া, তার বিরুদ্ধে কলেজে আয়োজিত মানববন্ধনে শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে চাপ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন অভিভাবক ও শিক্ষার্থী দাবি করেন, মানববন্ধনে অংশগ্রহণের জন্য কিছু শিক্ষক শিক্ষার্থীদের চাপ দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ফরিদ আহমেদ বলেন, আমার চাকরির বয়স আর মাত্র দুই মাস বাকি। এই সময়ের মধ্যে যদি দায়িত্বে ফিরতে না পারি, তাহলে অবসরজনিত প্রাপ্য, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং জীবনের শেষ বয়সের নিরাপত্তা—সবকিছুই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যাবে। আমি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচার ও স্বপদে পুনর্বহালের আবেদন জানাচ্ছি।
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিকের দাবি, কলেজটির চলমান পরিস্থিতির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন সত্য উদঘাটিত হবে, অন্যদিকে কলেজের স্বাভাবিক পরিবেশ ও সুশাসন নিশ্চিত করা সহজ হবে।