ফুটবল ও অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও বিশ্বকাপে ব্যর্থতার মুখ দেখেছে সৌদি আরব ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করলেই যে বিশ্বমঞ্চে সাফল্য আসে—এই ধারণা যে সবসময় সত্য নয়, তা আবারও প্রমাণিত হয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই দুই দেশ যেন ফুটবলে ‘টাকা ছিটিয়েও’ কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছে না।
সৌদি আরব আবারও বিশ্বকাপ থেকে আগেভাগেই বিদায় নিয়েছে। একটি তুলনামূলক সহজ গ্রুপে খেলেও তারা শেষ স্থানে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করে, যেখানে কেপ ভার্দে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে উঠে ইতিহাস গড়ে। কেপ ভার্দে এ পর্যায়ে খেলা সবচেয়ে ছোট দেশগুলোর একটি।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, নেইমার ও করিম বেনজেমার মতো তারকাদের দলে ভেড়ানোর মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্লাব ফুটবলে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখনো তাদের সাফল্য অধরা, বিশেষ করে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের দিকে এগোতে থাকা সময়ে।
ব্যর্থতার পর সৌদি আরব ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ইয়াসির আল-মিসেহাল পদত্যাগ করেন। তিনি বলেন, দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো দেশটির ফুটবলে “নতুন অধ্যায়” শুরু করতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে চার বছর আগে বিশ্বকাপ আয়োজন করা কাতারও মাত্র তিন ম্যাচ খেলে বিদায় নিয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে ইরান ও ইরাকের ক্ষেত্রেও।
এই বিশ্বকাপে আফ্রিকান দেশগুলোর সাফল্যের তুলনায় উপসাগরীয় দেশগুলোর পারফরম্যান্স ছিল অনেক পিছিয়ে—যেখানে ১০টির মধ্যে ৯টি আফ্রিকান দল নকআউট পর্বে পৌঁছেছে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র সৌদি আরবের গ্রুপ পর্ব থেকে বের হওয়ার আশা শেষ করে দেয়। ১৯৯৪ সালের পর এবারই প্রথম তারা গ্রুপ পর্ব পেরোতে ব্যর্থ হলো।
সৌদি কোচ জর্জিওস ডোনিস বলেন, ‘এটা আমরা যা আশা করেছিলাম তা নয়। সমমানের একটি দলের বিপক্ষে আমাদের পারফরম্যান্স ভালো হয়নি, যা অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।’
কাতার সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে নাটকীয়ভাবে শেষ মুহূর্তে গোল করে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ পয়েন্ট অর্জন করে ইতিহাস গড়ে। তবে ২০২২ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে আয়োজিত বিশ্বকাপে দুই ম্যাচেই বিদায়ের পর এবারও তাদের অভিযান শেষ হয়েছে হতাশাজনকভাবে।
কোচ জুলেন লোপেতেগি বলেন, ‘আমরা অন্তত দেখিয়েছি যে এই ধরনের ম্যাচে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারি।’
প্রাক্তন স্পেন ও রিয়াল মাদ্রিদের কোচ লোপেতেগির নিয়োগ ছিল কাতারের বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার একটি প্রচেষ্টা। সৌদি আরবের মতো তারা ইউরোপের বয়স্ক তারকাদের ভিড়ানোর পথে হাঁটেনি।
মাত্র ৩০ লাখ জনসংখ্যা এবং প্রায় ৩ লাখ নাগরিক থাকা সত্ত্বেও কাতার নিজস্ব প্রতিভা তৈরি করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে টানা দুইবার এশিয়ান কাপ জিতেছে। এতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শক্তিশালী দলগুলোর ওপর তারা আধিপত্য দেখিয়েছে।
তবুও সেই সাফল্য বিশ্বকাপে প্রতিফলিত হয়নি। চার বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপ আয়োজন এবং আটটি আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মাণে বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরও দ্রুত বিদায় তাদের জন্য বড় হতাশা।
লোপেতেগি বলেন, ‘আপনি অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। আমরা জানি আমরা কারা। তবে এটি একটি ছোট দেশ হলেও বড় আবেগ ও বড় বিনিয়োগের দেশ। আমাদের প্রতিদিন উন্নতি করতে হবে এবং আমরা সেটাই করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অবশ্যই আশাবাদী।’
সৌদি আরবের নজর এখন ভবিষ্যতের দিকে, বিশেষ করে ২০৩৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতিতে।
ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে দেশটি বড় বিনিয়োগ করছে—প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেড অধিগ্রহণ, LIV গলফ চালু, বক্সিং ও ফর্মুলা ওয়ান আয়োজনসহ নানা উদ্যোগ এর অংশ।
বিশ্বকাপ জয় সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন হতে পারে, কারণ তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন খাতে প্রবেশের লক্ষ্য নিয়েছে দেশটি।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো তারকাদের আগমন সৌদি লিগের জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এসব তারকা মান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
তবে চার বছর আগে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন ঘটালেও এবার তেমন কোনো স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করতে পারেনি সৌদি আরব। টানা ছয় বিশ্বকাপে তারা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছে।
কোচ ডোনিস বলেন, ‘আরব লিগে এসব তারকা খেললে প্রতিযোগিতা বাড়ে, যা খেলোয়াড়দের উন্নতিতে সাহায্য করে। কিন্তু জাতীয় দলে বিষয়টি ভিন্ন, এখানে মানসিকতার ব্যাপার থাকে।’
২০৩৪ বিশ্বকাপ সামনে রেখে এখন স্থানীয় খেলোয়াড় উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সৌদি আরব।
বিদেশি তারকা আনার প্রবণতা কিছুটা কমে এসেছে। এমনকি নেইমারের মতো বড় তারকারাও দল ছাড়ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলের সাবেক স্পোর্টিং ডিরেক্টর ম্যাট ক্রকারকে সৌদি আরবে ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত তিন বছরে যুব উন্নয়নেও বিনিয়োগ দ্বিগুণ করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও কাতার যখন বড় বিনিয়োগে ফুটবল দুনিয়ায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, তখন ইরান ১৯৭৮ সাল থেকে নিয়মিত বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি ও ভ্রমণ জটিলতার মধ্যেও তারা প্রস্তুতিতে বাধার মুখে পড়ে এবং তিনটি ড্র নিয়ে অল্পের জন্য সেরা তৃতীয় দল হিসেবে পরের রাউন্ডে যেতে পারেনি। সাতবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েও তারা কখনো গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করতে পারেনি।
ইরাকের ক্ষেত্রেও চিত্র একই—দুইবার বিশ্বকাপে খেলেছে, যার ব্যবধান ছিল ৪০ বছর।
৪৮ দলের সম্প্রসারিত বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে ও কঙ্গোর মতো দেশ ইতিহাস গড়ার সুযোগ পেলেও উপসাগরীয় দেশগুলো এখনো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সাফল্যের অপেক্ষায় রয়েছে।