বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে গত এক সপ্তাহে অন্তত ১৪০টি পরিবারের বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের আতঙ্কে শতাধিক পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নতুন জেগে ওঠা চরে কিংবা অন্যত্র আশ্রয় নিচ্ছে। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার হাটশেরপুর ইউনিয়নের চকরথিনাথ, ধনারপাড়া, করনজাপাড়া, শেরপুর, শিমুলবাড়ী, নয়া পাড়া, কর্ণিবাড়ী ও দুব্বাগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে যমুনার ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে প্রায় দুই হাজার পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছে এবং হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
সর্বশেষ ১০ দিন ধরে চকরথিনাথ ও শেরপুর এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবার তাদের বসতঘর ভেঙে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ নতুন চরে বসতি গড়ছেন, আবার কেউ এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে চলছে বাড়িঘর সরিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততা। কেউ ঘরের টিন খুলছেন, কেউ গাছ কেটে ফেলছেন, আবার কেউ নৌকায় করে ঘরের চালা ও আসবাবপত্র স্থানান্তর করছেন। পরিবারগুলোর নারী সদস্যরাও এ কাজে সহযোগিতা করছেন। তবে নিজেদের ভিটেমাটি হারানোর বেদনায় অনেকের চোখে পানি দেখা গেছে।

নদীভাঙনের ফলে ইতোমধ্যে দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরথিনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের কবলে পড়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর নির্মাণ করে পাঠদান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
চকরথিনাথ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল শেখ (৬৫) জানান, তিনি জীবনে চারবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন। সাত বছর আগে নতুন করে বাড়ি নির্মাণ করলেও এবার আবারও ভিটেমাটি হারাতে হয়েছে। তিনি দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
হাটশেরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর মো. মেহেদী হাসান আলো বলেন, প্রথমে ১৪০টি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা করা হলেও বুধবার পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে ১৯৫-এ পৌঁছেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার ভাঙনের শিকার হচ্ছে। তিনি দ্রুত নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি জানান।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তবে বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমাইয়া ফেরদৌস জানান, ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা) আসনের সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম বলেন, যমুনা ভাঙন মোকাবিলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। দ্রুত প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কয়েকটি মসজিদ, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রায় ৩০০ পরিবারের বসতভিটা ও কয়েক হাজার বিঘা ফসলি জমি যমুনার গর্ভে বিলীন হতে পারে।