গ্রুপ পর্বে দাপুটে পারফরম্যান্স ধরে রেখে শীর্ষস্থান নিশ্চিত করেছে মেক্সিকো। শেষ ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে জায়গা করে নেয় উত্তর আমেরিকার দলটি।
অন্যদিকে টুর্নামেন্টে টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে চেক প্রজাতন্ত্রকে। শক্তিশালী আক্রমণ ও সংগঠিত ফুটবলের প্রদর্শনীতে মেক্সিকো নিজেদের অন্যতম দাবিদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ম্যাচের ৫৫ মিনিট পেরিয়ে গেছে তখন। গোল তো দূরের কথা, তেমন কোনো সম্ভাবনাও জাগাতে পারেনি দুই দল। হুট করেই চমকপ্রদ এক মুহূর্ত। মাঝমাঠে তিনজনের ভেতর থেকে দারুণভাবে বল বের করে পাস দিলেন লুইস রোমো।
সেই বল ধরে ঝড়ের বেগে ছুটে বক্সের ভেতর ঢুকে আগুয়ান গোলকিপারকে শরীরের ঝটকায় বিভ্রান্ত করে বল জালে পাঠালেন মাতেও চাভেজ। মেক্সিকোর সমর্থনে ঠাসা গ্যালারির গর্জনে প্রকম্পিত তখন চারপাশ।
সেই গোলের মিনিট পাঁচেক পর গোল করলেন হুলিয়ান কিনোনেস। একদম শেষ সময়ে গোল করে জয়কে পূর্ণতা দিলেন আলভারো ফিদালগো। মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে দ্বিতীয়ার্ধের দুরন্ত পারফরম্যান্সে বিশ্বকাপের ‘এ’ গ্রুপে চেকিয়াকে ৩-০ গোলে হারাল মেক্সিকো।
এবারের আসরের প্রথম দল হিসেবে তিন ম্যাচের সবকটি জিতল তারা। ১৯৯০ সালে ইতালির পর স্বাগতিক দেশের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জয়ের প্রথম নজিরও এটিই।
দুই গোলের পর গ্যালারি যখন গানে ও স্লোগানে উত্তাল, এর মধ্যেই আসে ইতিহাস গড়া মুহূর্ত। ৭৮তম মিনিটে গোলকিপার রাউল রাহনেলের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন গিয়ের্মো ওচোয়া। ৪০ বছর বয়সী গোলকিপারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ এটি, মাঠে নামলেন তিনি চতুর্থ বিশ্বকাপে।
আগেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত করে ফেলা মেক্সিকোর জন্য এই ম্যাচের গুরুত্ব তেমন একটা ছিল না। একাদশে তাই পাঁচটি পরিবর্তন আনে তারা।
বিশ্বকাপে এই নিয়ে মাত্র দ্বিতীয়বার এক ম্যাচ থেকে অন্য ম্যাচে শুরুর একাদশে অন্তত পাঁচটি পরিবর্তন আনল মেক্সিকো। সবশেষ ১৯৭৮ সালে তারা দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় ম্যাচে ছয়টি পরিবর্তন এনেছিল এবং পোল্যান্ডের কাছে ৩-১ গোলে হেরেছিল।
এই পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একজন হলেন হিলবের্তো মোরা। ১৯৫৪ বিশ্বকাপের মেক্সিকোর সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে প্রথম একাদশে সুযোগ পান ১৭ বছর ২৫৩ দিন বয়সী মিডফিল্ডার।
এছাড়াও, ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নাইজেরিয়ার ফেমি ওপাবুনমির (১৭ বছর ১০১ দিন) পর তিনিই বিশ্বকাপের প্রথম একাদশে সুযোগ পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়।
ম্যাচের প্রথম মিনিট পাঁচেক বল বেশি ছিল মেক্সিকোর পায়ে। তবে সপ্তম মিনিটে দারুণ এক সুযোগ পায় চেকিয়া। ডান প্রান্ত থেকে মেক্সিকোর একজনের পায়ে লেগে আসা বল ফাঁকায় পেয়ে যান দেনিস ভিসিনস্কি। তার শট দূরের পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়।
একটু পর মেক্সিকো দ্রুত গতিতে পাল্টা আক্রমণ করে তিন বনাম দুই পরিস্থিতি তৈরি করে, কিন্তু লুইস রোমো ভেতরে ঢুকে আসায় তারা কোনোমতে একটি শটও নিতে পারেনি। চতুর্দশ মিনিটে ভিসিনস্কির শট ওপর দিয়ে চলে যায়।
পানি পানের বিরতির পর ২৬তম মিনিটে বাঁ প্রান্ত দিয়ে বিপজ্জনকভা বক্সে ঢুকে পড়েন সেই ভিসিনস্কি। তবে সঙ্গী পাননি কাউকে। মেক্সিকোর রক্ষণ জটলা থেকে বরে হতেও পারেননি।
ম্যাচের প্রথম ৩৫ মিনিটে মেক্সিকো একটি শটও নিতে পারেনি গোলে। ৩৭তম মিনিটে প্রথম চেষ্টা করেন ইজরায়েল রায়েস। বক্মের ভেতর হেড থেকে উড়ে আসা বলে তার ওভারহেড কিক বেশ বাইরে দিয়েই চলে যায়। দু মিনিট পর প্রথমবার লক্ষ্যে বল রাখতে পারে তারা। হোর্হে সানচেরে জোরাল শট ঠেকিয়ে দেন চেকিয়ার গোলকিপার মাতেই কোভার। ৩০ সেকেন্ড পর রবের্তো আলভারাদোর শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বক্সের বাইরে ফাঁকা পেয়ে আচমকা শট নেন হুলিয়ান কিনোনেস। এবারের আসরের প্রথম গোলস্কোরারের এই শট ওপর দিয়ে চলে যায়।
প্রথমার্ধে চেকিয়া গোলে ৫টি শট নিয়ে একটিও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অন্তত সেই খরা কাটাতে পারে তারা। তবে লুকাস চের্ভের দুর্বল শট ধরতে কোনো সমস্যই হয়নি মেক্সিকোর গোলকিপারের।
৫১তম মিটে বিপজ্জনকভাবে বল নিয়ে ভেতরে ঢোকে মেক্সিকো। ডান প্রান্ত থেকে ম্যাচের প্রথম কর্নারটি হয় দ্বিতীয়ার্ধর ৫৩তম মিনিটে। তবে তা কাজে লাগাতে পারেনি চেকিয়া। এর পরপরই চাভেজের সেই গোলে এগিয়ে যায় মেক্সিকো। সেই গোলের রেশ থাকতে থাকতেই আরেকটি গোল।
৬১তম মিনিটে ড্রিবল করে দারুণভাবে এগিয়ে যান মোরা। তুমুল প্রতিভাবান তরুণ চাইলেই সহজে ডান দিকে পাস দিতে পারতেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের দুজনের মাঝ দিয়ে বুদ্ধিদীপ্তভাবে বল বাড়ান তিনি ভেতরে হোর্হে সানচেজের দিকে। তাকে আটকাতে এগিয়ে আসেন চেকিয়ার গোলকিপার কোভার। কিন্তু তার শরীরে লেগে বল ছয় গজের বক্সে ঢুকে পড়ে।
সেই বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তমাস হোলস অদ্ভুতভাবে মেরে বসেন সানচেজের দিকে, যিনি কোভারের পাশে পড়ে মাটিতেই ছিলেন। তার গায়ে লেগে ফেরত আসা বলে স্লাইডিংরত হোলসের সেকেন্ডের ভগ্নাংশ আগে ছোঁ মেরে শট নিয়ে ফাঁকা জালে পাঠিয়ে দেন কিনোনেস।
দুই গোলের পর চেকিয়া আরও মিইয়ে যায়। মেক্সিকো দাপট ধরে রেখেই এগোয়। আরেকটি গোলের দেখা যায় তারা যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে। গোলটি পেতে পারতেন বদলি নামা সান্তিয়ানো হিমেনেজ। কিন্তু তার শট দারুণ রিফ্লেক্সে ঠেকিয়ে দেন গোলকিপার কোভার। ফিরতি বলে দারুণ ফিনিশিংয়ে গ্যালারি আরও উত্তাল করে তোলেন বদলি নামা আরেকট ফুটবলার ফিদালগো।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সুদীর্ঘ পথচলায় প্রথমবার গ্রুপ পর্বে তিনটি ম্যাচই জিতল মেক্সিকো। নকআউট পর্বেও নিজেদের মাঠে খেলার সুযোগ পাবে তারা, যে ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপ সি, ই, এফ, এইচ বা আই থেকে তৃতীয় স্থানে থাকা দল।