বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, সিলেটের হাওর এলাকা মানুষের আয়ের প্রধান উৎস্য হলো বোরো ধান। বছরে মাত্র একবার এখানে ফসল ফলে। কিন্তু ২০২৬ সালের এপ্রিল ও মে মাসের শুরুতেই অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে দেশের হাওর অঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে। এতে প্রায় হাওরের মোট আবাদি জমির প্রায় ১১ শতাংশ ডুবে যায়। যা ৪৯ হাজার হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ বা আংশিক নষ্ট হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ২ লাখ ৩৬ হাজার কৃষক। কিন্তু স্বজনপ্রীতি, সরকারি কর্মকর্তাদের হিসাব এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তালিকা নিয়ে হযবরল অবস্থা রয়েছে। ফলে সরকারি সহায়তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সমস্যা। এ পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের একটি সঠিক ও স্বচ্ছ তালিকা তৈরি করা এবং তাদের কাছে সময়মতো সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নাম প্রকশে অনচ্ছিুক একটি সূত্র বলছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একটি বিশেষ আর্থিক সহায়তার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জনপ্রতি সাড়ে সাত হাজার টাকা করে সরাসরি অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে সরকারের মোট ১৭৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জ্যোতিশংকর বলেন, যদি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি সহায়তার পাশাপাশি পুনর্বাসন করা হয়, তবে যারা সরকারি সহায়তা পাবের তারা প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কি না তা যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও এখন তাদের পক্ষে সেই ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত ৯ দিনের টানা বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮১১ জন ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও বর্গাচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে কৃষক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কৃষি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও বেশি হতে পারে। কারণ, বহু কৃষক ধান কাটলেও তা ঘরে তুলতে পারেননি, শুকাতে না পারা কিংবা পানিতে পচে যাওয়ায় বাজারজাত করতে পারেননি।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের জয়কা ইউনিয়নের রামনগর গ্রামের কৃষক হাবিব জানান, ফসলহানির পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য দ্রুত অর্থ ও খাদ্য সহায়তার ঘোষণা দেয় সরকার। এখনো কোনো কৃষক সহায়তা পাননি।
কিশোরগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্র জানায়, প্রাথমিকভাবে ৫২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা মাসে সাড়ে সাত হাজার টাকা, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্তরা পাঁচ হাজার টাকা এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তরা আড়াই হাজার টাকা করে তিন মাস সহায়তা পাবেন। পাশাপাশি প্রত্যেককে প্রতি মাসে ২০ কেজি খাদ্যশস্য দেওয়া হবে। তব ত্রাণ মন্ত্রণালয়য়ের মাধ্যমে কিছু জায়গায় ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এটি বেশ কয়েকমাস ধরে চলবে।
জানা গেছে, সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা করা হয়েছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জনের। পরে অনুমোদন দেওয়া হয় ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের নাম। তাদের প্রত্যেককে তিন মাস ধরে মাসে ৩ হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফসলহানির ক্ষতির সঙ্গে সহায়তার তালিকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন এলাকা থেকে অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে বাদ দিয়ে জনপ্রতিনিধির স্বজন, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠজন এবং অকৃষিজীবীর নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরের কৃষক নরকুল ইসলাম বলেন, যারা টাঙ্গুয়ার হাওরে চাষ করেছে, তাদের অনেকের নাম নেই। আবার যাদের জমি নেই, তারাও সহায়তা পাচ্ছে।
এদিকে সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, বর্গাচাষিরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ তাদের অনেকের নাম তালিকায় নেই। আবার যারা চাষই করেননি, তারাও তালিকাভুক্ত হয়েছেন। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা, মিঠামইন ও করিমগঞ্জ এলাকায়ও তালিকা নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
কয়েকজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তালিকায় স্বজনপ্রীতি হয়েছে। কোনো কোনো ওয়ার্ডে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাদ পড়েছেন। আবার একই পরিবারের বাবা-ছেলের নামও তালিকাভুক্ত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এমন ব্যক্তির নাম তালিকায় এসেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বা সিলেটে ব্যবসা করেন কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত।
অনেকেই কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। তবু তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক হিসেবে সরকারি সহায়তার তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রতিটি সেচ প্রকল্পের স্কিমভিত্তিক কৃষকের বিস্তারিত তথ্য আগে থেকেই সংরক্ষিত থাকে। কোন কৃষক কত জমি আবাদ করেন, কে বর্গাচাষি, কে প্রকৃত চাষি এসব তথ্য ব্যবহার না করেই তড়িঘড়ি করে তালিকা করায় এই জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অষ্টগ্রাম সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু বলেন, প্রতিটি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থাপকের কাছে প্রকৃত কৃষকের নির্ভুল তালিকা রয়েছে। সেই তালিকা অনুসরণ করলে অভিযোগের সুযোগ থাকত না।
সুনামগঞ্জের শাল্লায় অভিযোগ উঠেছে, কয়েকজন জনপ্রতিনিধি নিজেদের পরিবারের একাধিক সদস্যকে তালিকাভুক্ত করেছেন। কোথাও একই পরিবারের সাত থেকে আটজন সদস্যের নামও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের অনেকে তালিকার বাইরে রয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুপারিশ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমেও কিছু নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কৃষকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষককে বাদ দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নন এমন ব্যক্তিদের অনুদানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, তালিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। অযোগ্য ব্যক্তির নাম পাওয়া গেলে তদন্ত করে বাদ দেওয়া হবে। অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বর্গাচাষিরা। তাই তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দিতে হবে। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না করা গেলে সরকারি সহায়তার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
জানা গেছে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর তথা কিশোরগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৫২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০০ কোটি ২৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। হাওরাঞ্চলে ৪ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৩ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছিল। সেখানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৫২ হাজার ৫৭৫ হেক্টর বা ১১ দশমিক ৫৫ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে চালের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন। তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১০০ কোটি ২৮ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৯০ জন।
নাম প্রকাশে অনচ্ছিুক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক বলেন, হাওরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা। অনেকেই এনজিও, সমিতি কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফসলহানির কারণে তারা চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই ত্রাণকার্য চালাতে ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৪৯ জন কৃষকের মাঝে মাসে ১৫ কেজি হারে চাল বিতরণ করা হবে। এতে চালের পরিমাণ দাঁড়াবে ৭৩৩২ দশমিক ১৫ মেট্রিক টন। সেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪৮৮৮ দশমিক ৫ টন এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেওয়া হবে ২৪৪৪ দশমিক ২৫ মেট্রিক টন চাল। আর নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। তাতে প্রয়োজন পড়বে ১৪৬ কোটি ৬৫ লাখ ৪১ হাজার টাকা।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত নতুন জাতের ব্রি ধান ১১৮ বীজতলা থেকে ধান পেকে কাটা পর্যন্ত প্রায় ১৪৩ দিনের মতো সময় নেয়। এই জাতটি মূলত হাওর অঞ্চলের বোরো মৌসুমে চাষের উপযোগী ও প্রজনন পর্যায়ে ঠান্ডা সহনশীল। হাওড়াঞ্চলের অতি বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যায় বোরো ধান রক্ষায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) নতুন জাতের ধান আবিষ্কার করেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান বলেন, ২ লাখ ৩০ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন চালের ক্ষতির কারণে জাতীয়ভাবে খাদ্য সংকট তৈরির সুযোগ নেই। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, আগামী বোরো মৌসুমের জন্য হাওরাঞ্চলে ব্রি-১১৮ ধান চাষ করলে ভালো হয়। এর ফলন ভালো ও আগাম ঘরে তুলতে পারবে।