ঈদ আনন্দ মিলিয়ে যায় শোকের আবহে

শাকিল আহমেদ

জাতীয়

ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বছরের পর বছর কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে বন্দি থাকা মানুষগুলো

2026-06-02T11:41:05+00:00
2026-06-02T11:41:05+00:00
  রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬,
৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
জাতীয়
হাসপাতালে আর্তনাদ, প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা
ঈদ আনন্দ মিলিয়ে যায় শোকের আবহে
শাকিল আহমেদ
মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ১১:৪১ এএম 
সংগৃহীত ছবি
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই প্রিয়জনের কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। বছরের পর বছর কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে বন্দি থাকা মানুষগুলো এই সময়টাতেই ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। 

বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেল, যেভাবেই হোক পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু সেই আনন্দযাত্রা প্রতি বছরই যেন রক্তাক্ত হয়ে ওঠে দেশের সড়ক-মহাসড়কে। এবারের ঈদুল আজহার যাত্রাও তার ব্যতিক্রম নয়।

ঈদের আগে ও পরের কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক এবং শহরতলির পথে পথে ছড়িয়ে পড়েছে দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। কোথাও বাসের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষ, কোথাও মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণহানি, আবার কোথাও ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতায় মুহূর্তেই নিভে গেছে একাধিক প্রাণ। ঈদের আনন্দ শেষে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ, কিন্তু অসংখ্য পরিবার এখনও শোকের ভার বয়ে বেড়াচ্ছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ২১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঈদকেন্দ্রিক যাতায়াতের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২৪১ জন নিহত এবং ৫৪০ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি এই তথ্য প্রকাশ করেছে। শুধু ঈদের মূল ছুটির সাত দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৭৯ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক দুর্ঘটনার খবর স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকে যায় কিংবা আহতদের পরবর্তী মৃত্যুর তথ্য পরিসংখ্যানে যুক্ত হয় না। 

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দেশের পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আইন প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতি ঈদেই একই ধরনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। মহাসড়ক যেন 

মৃত্যুর ফাঁদ : এবারের ঈদযাত্রার সবচেয়ে আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিহাতীতে। রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে অন্তত ১৫ জন নিহত হন। আহত হন আরও বেশ কয়েকজন। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে অনেক মরদেহ শনাক্ত করতেও বেগ পেতে হয়েছে।

শুধু কালিহাতী নয়, ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কেও একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে পাঁচটি পৃথক দুর্ঘটনায় অন্তত ছয়জন নিহত ও প্রায় ১৫ জন আহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং রাতের বেলায় বেপরোয়া যান চলাচল এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

ফেনী, কুমিল্লা, সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, যশোর ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষ, কোথাও ট্রাকচাপায় প্রাণ গেছে পথচারীর, আবার কোথাও সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে ধাক্কা লেগে একাধিক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

মোটরসাইকেল: নতুন আতঙ্ক : সড়ক দুর্ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হয়ে উঠেছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। ঈদের সময় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে এবং যানজট এড়াতে বিপুলসংখ্যক মানুষ মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। কিন্তু এই বাহনটিই এখন সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির কারণগুলোর একটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে অতিরিক্ত গতি, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা, মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করার প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে এক মোটরসাইকেলে তিন থেকে চারজন যাত্রী বহন করাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এবারের ঈদে সংঘটিত দুর্ঘটনাগুলোর বড় অংশেই মোটরসাইকেল জড়িত ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ফলে সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন।

কেন কমছে না দুর্ঘটনা? প্রশ্নটি নতুন নয়। প্রতি ঈদের পরই এই প্রশ্ন সামনে আসে। তবু পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী অতিরিক্ত গতি। এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্সবিহীন চালক, চালকদের অপর্যাপ্ত বিশ্রাম, সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং আইন প্রয়োগে শৈথিল্যও বড় কারণ।

পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঈদের সময় অতিরিক্ত ট্রিপ দেওয়ার চাপ থাকে। ফলে অনেক চালক টানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য হন। শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক অবসাদ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এর ফলেই বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে চলমান সংস্কারকাজ, অসমাপ্ত সড়ক অবকাঠামো, পর্যাপ্ত সাইনবোর্ডের অভাব, অপ্রতুল আলোকসজ্জা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ইউ-টার্নও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন : ঈদকে সামনে রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), হাইওয়ে পুলিশ, জেলা প্রশাসন এবং অন্যান্য সংস্থা যৌথভাবে বিশেষ নজরদারির ঘোষণা দেয়। 

ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় রোধ, ট্রাফিক মনিটরিং বৃদ্ধি এবং মহাসড়কে আইনশৃঙ্খলা জোরদারের মতো নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি দাবির বড় ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে।

দুর্ঘটনার সংখ্যা এবং প্রাণহানির পরিসংখ্যান বলছে, নজরদারি থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাময়িক অভিযান দিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন টেকসই ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা।

প্রতি ঈদেই একই গল্প : সড়ক দুর্ঘটনা যেন এখন দেশের উৎসব সংস্কৃতির এক বেদনাদায়ক অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ঈদুল ফিতরেও সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে শত শত দুর্ঘটনায় প্রায় চার শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। আহত হয়েছিলেন এক হাজারেরও বেশি মানুষ। প্রতি ঈদের আগে নিরাপদ যাত্রার আশ্বাস দেওয়া হয়। বাড়ানো হয় নজরদারি। চালানো হয় সচেতনতামূলক প্রচারণা। কিন্তু ঈদ শেষে আবারও সামনে আসে নিহতদের দীর্ঘ তালিকা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, সমস্যা কোথায়? পরিকল্পনায়, বাস্তবায়নে, নাকি জবাবদিহির অভাবে?

পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষের কান্না : সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি পরিবারের গল্প। একজন নিহত ব্যক্তি শুধু একটি পরিসংখ্যান নন; তিনি কারও বাবা, মা, সন্তান, ভাই, বোন কিংবা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনও চিকিৎসাধীন রয়েছেন অসংখ্য আহত ব্যক্তি। তাঁদের অনেকেই হয়তো আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। কেউ হারিয়েছেন হাত-পা, কেউ হয়েছেন স্থায়ীভাবে পঙ্গু। দুর্ঘটনার ক্ষত শুধু নিহতদের পরিবার নয়, রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজব্যবস্থাকেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন, এবারের ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বিভিন্ন রুটে বাস মালিক ও পরিবহন সংশ্লিষ্টরা অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে। 

অতিরিক্ত ভাড়া বহনের সামর্থ্য না থাকায় অনেক শ্রমজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, ট্রেনের ছাদ ও খোলা পণ্যবাহী যানবাহনে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়েছে। এতে সড়কে দুর্ঘটনা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি প্রাণ হারিয়েছেন অনেকেই।  
         
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর ঈদ মৌসুমে অতিরিক্ত ভাড়ার চাপে নিম্নআয়ের মানুষ বাসের ছাদ, ট্রেনের ছাদ, খোলা ট্রাক ও পণ্যবাহী যানবাহনে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণে বাধ্য হন। অথচ যাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি সচল, তাদের নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিতে রাষ্ট্র বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। 

সমাধানের পথ কোথায়? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্ঘটনা কমাতে মৌসুমি তৎপরতার বাইরে যেতে হবে। প্রয়োজন সারা বছরব্যাপী কঠোর তদারকি, দক্ষ চালক তৈরি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন সম্পূর্ণ বন্ধ, প্রযুক্তিনির্ভর গতিনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

একই সঙ্গে মহাসড়কে মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ, চালকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার এবং পরিবহন খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করারও বিকল্প নেই।            

ঈদের ছুটি শেষ হয়েছে। কর্মব্যস্ত জীবনে ফিরছে দেশ। কিন্তু বহু পরিবারের কাছে এবারের ঈদ চিরদিনের জন্য হয়ে থাকবে শোকের স্মৃতি। 

মহাসড়কের ধুলোয় মিশে থাকা রক্তের দাগ আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, নিরাপদ সড়কের প্রতিশ্রুতি এখনও বাস্তবে রূপ নেয়নি। আর যতদিন না সড়কে শৃঙ্খলা, জবাবদিহি ও কার্যকর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি দেশের পথে পথে দেখা মিলবে নতুন নতুন লাশের মিছিল।


Loading...
Loading...

জাতীয়- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: