কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। তার সাহিত্য, সংগীত ও বিদ্রোহী চেতনা বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও মুক্তির সংগ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই বিংশ শতাব্দীর বাঙালির মননে কাজী নজরুল ইসলামের মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরিসীম। নজরুলের বিরলকীর্তি ও অসাধারণ সব কবিতা-গান যুগ যুগ ধরে আমাদের প্রেরণা দিয়ে আসছে। কবিকে যাতে নতুন প্রজন্ম ভালো করে চিনতে পারে, জানতে পারে, কবির সম্পর্কে ধারণা করতে পারে সেকারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে, আগামী এক বছর নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেছেন।
তিনি ময়মনসিংহের ত্রিশালে ২৩ মে ২০২৬ তারিখ শনিবার (১৮ জুলাই) সন্ধ্যায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে আগামী এক বছরকে নজরুল বর্ষ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘শুধু ঘোষণাই করতে চাই না, আমি ওনাদেরকে বলেছি যে আলাপ-আলোচনা করে আমরা নতুন প্রজন্মের কাছে কাজী নজরুল ইসলামকে তুলে ধরতে চাই। সেই জন্য আমি বলেছি যে আপনারা চেষ্টা করবেন বাংলাদেশের প্রতিটি জেলাতে যাতে আগামী এক বছর নজরুল ইভেন্ট বা এ রকম অনুষ্ঠান হয়। যাতে নতুন প্রজন্ম বুঝতে পারে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি। কবিকে যাতে নতুন প্রজন্ম ভালো করে চিনতে পারে, জানতে পারে, কবির সম্পর্কে ধারণা করতে পারে।’
‘নজরুল বর্ষ’ ঘোষণা করে ইতোমধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। ২১ জুন ২০২৬ তারিখে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী চলতি বছরের ২৫ মে থেকে আগামী বছরের ২৫ মে পর্যন্ত এক বছরব্যাপী পালিত হবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী, প্রেম ও তারুণ্যের চেতনা তুলে ধরতে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিস্তারিত কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশজুড়ে জাতীয় কবিকে স্মরণ ও তার সাহিত্যকর্ম প্রসারের দায়িত্বে রয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্তের পরও নজরুল বর্ষ পালনে সুস্পষ্ট কোনো কর্মসূচি বা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়নি।
এ বিষয়ে কবি লেখক ও গবেষক ড, মাহবুব হাসান বলেন, জাতীয় কবির নামে যে একটা বর্ষ হলো সেটি জাতিকে জানাতে হবে। সেটা ভালোভাবে প্রকাশ করতে হবে। জাতিসত্তার এই কবিকে যে আমরা অন্তরে লালন করি তার রূপটা দেখাতে হবে। মন্ত্রণালয়কে সেভাবে নড়াচড়া করতে দেখা যাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা এক সপ্তাহের মধ্যে কর্মসূচি তৈরি করে তা প্রকাশ করা উচিত ছিল। নজরুল বর্ষ যথাযথভাবে পালন করা হলে নজরুলকে আমরা নতুনভাবে তুলে ধরতে পারব। কারণ নজরুলকে আমাদের চর্চা করতেই হবে।
লেখক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও জাসাসের সাবেক সভাপতি রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী এ ঘোষণা ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। নজরুল বর্ষ ঘোষণাকে অভিনন্দিত করি। তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে কর্মসূচি বাস্তবায়নে আরও সিরিয়াস ভূমিকা নিতে হবে। তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা চোখে পড়ছে না। সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে নজরুলকে নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে। বহু সংগঠন রয়েছে তাদের সেভাবে কর্মসূচি নিতে দেখছি না। সবাই মিলে সরকারের এই মহতী উদ্যোগকে সফল করতে হবে।
প্রসঙ্গত: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রতিষ্ঠা ও তার উত্তরাধিকার সংরক্ষণে তৎকালীন সেনাপ্রধান এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ৪ মে বাংলাদেশে তার আগমনের দিন থেকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় কবি’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট জাতীয় কবির মৃত্যুর পর তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একজন মন্ত্রী কবির মরদেহ কলকাতায় নিয়ে যেতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তখন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে কবিকে ৩০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এর মাধ্যমে জাতীয় কবির চিরনিদ্রার স্থান বাংলাদেশেই নিশ্চিত হয় এবং দেশের মানুষ তাকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ধারণ করার সুযোগ পায়।